ইরানের তেল, জাতীয়করণ ও ষড়যন্ত্রের গল্প

· Prothom Alo

পৃথিবীর আধুনিক ইতিহাসের অনেক বড় মোড় ঘুরেছে তেলকে ঘিরে। মাটির নিচের কালো এই তরল শুধু জ্বালানি নয়—এটি শক্তি, অর্থনীতি, সাম্রাজ্য আর যুদ্ধের গল্পও। প্রথম বাণিজ্যিক কূপ খনন থেকে জন ডি রকফেলারের উত্থান, বাকুর তেলজ্বর, দুই বিশ্বযুদ্ধে জ্বালানির লড়াই, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির উত্থান, ১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান, কুয়েতে ইরাকি আগ্রাসন থেকে আজকের ভূরাজনীতি—সবকিছুর কেন্দ্রে আছে তেল। ‘তেলের গল্প’ সিরিজে আমরা দেখব, কীভাবে একটি সম্পদ বদলে দিয়েছে মানচিত্র, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মানুষের জীবন। আজ চতুর্থ পর্ব।

আগের তিন পর্বে ছিল আধুনিক তেলশিল্পের শুরু, রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের উত্থান, বাকু ও শেলের মাধ্যমে তেলের বিশ্বায়ন আর ইরান-ইরাক-আরবে শক্তির কেন্দ্র সরে যাওয়ার গল্প। দুই বিশ্বযুদ্ধে তেল জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে। এরপর সৌদি আরবের দরিদ্র মরুরাজ্য থেকে তেলসমৃদ্ধ শক্তি হয়ে ওঠার কাহিনি আসে। ১৯৩৮ সালে দাম্মাম ৭ নম্বর কূপে তেল আবিষ্কারের পর বদলে যায় সৌদির ভাগ্য। আরামকো, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক ও ৫০-৫০ মুনাফা চুক্তির মাধ্যমে তেল বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে জায়গা নেয়।

পাওয়া গেল ইরানের তেল

মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বড় বাণিজ্যিক তেল আবিষ্কার হয়েছিল কিন্তু পারস্যে; অর্থাৎ আজকের ইরানে—১৯০৮ সালে। গল্পটা শুরু হয় উইলিয়াম নক্স ডি’আর্সিকে দিয়ে। তিনি ছিলেন এক ধনী ব্রিটিশ ব্যবসায়ী। ১৯০১ সালে পারস্যের কাজার শাসক মোজাফফর উদ্দিন শাহ তাঁর হাতে তেল অনুসন্ধানের ইজারা দেন। ডি’আর্সি নিজে মাঠে কাজ করেননি; বরং প্রকৌশলী ও অনুসন্ধানকারী জর্জ বার্নার্ড রেনল্ডসকে দায়িত্ব দেন তেল খুঁজে বের করার জন্য।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

উইলিয়াম নক্স ডি’আর্সি

এরপর শুরু হয় বহু বছরের কঠিন অনুসন্ধান। গরম, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, পরিবহনসমস্যা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব আর টাকার টান—সব মিলিয়ে কাজ প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। খরচ বাড়ছিল, ডি’আর্সি প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়ছিলেন। ১৯০৮ সালের শুরুর দিকে লন্ডন থেকে রেনল্ডসকে কাজ গুটিয়ে নিতে বলাও হয়েছিল। পরে বার্মা অয়েল কোম্পানি অর্থ দিয়ে প্রকল্পটি বাঁচিয়ে রাখে।

১৯০৮ সালের ২৬ মে ভোর চারটার দিকে পারস্যের খুজেস্তান অঞ্চলের মাসজিদ-ই-সোলাইমান-এ তেল বেরিয়ে আসে। এটিই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম বড় বাণিজ্যিক তেল আবিষ্কার। যেদিন প্রকল্প প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে, সেদিনই বড় আবিষ্কার ঘটে।
এর আগে তেলশিল্পের বড় কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বাকু। কিন্তু ইরানে তেল আবিষ্কারের পর পরিষ্কার হয়ে যায় যে মধ্যপ্রাচ্যের মাটির নিচে বিপুল তেলসম্পদ আছে। পরবর্তী দশকগুলোতে এটাই ব্রিটিশকৌশল, নৌবাহিনীর জ্বালানিনীতি, মার্কিন উপস্থিতি, ইরানের রাজনীতি আর শেষ পর্যন্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বদলে দেয়।

পাওয়া গেল ইরানে প্রথম তেল

তেল আবিষ্কারের পর ১৯০৯ সালে গঠিত হয় অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি। পরে নাম বদলে অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি হয় এবং আরও পরে সেটিই ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) নামে পরিচিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকার অ্যাংলো-পার্সিয়ানের ৫১ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। এটি ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ রাষ্ট্র সরাসরি একটি তেল কোম্পানির মালিকানায় ঢুকে পড়ে। চার্চিল সংসদে যুক্তি দেন, নৌবাহিনী ও সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য ব্রিটেনকে নির্ভরযোগ্য তেল উৎস নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

তবে যুদ্ধের পরে ১৯২০-এর দশকে ইরানের ভেতরে অসন্তোষ জমতে শুরু করে। অভিযোগ ছিল, দেশের সম্পদ বিদেশিরা ব্যবহার করছে, কিন্তু ইরান তার ন্যায্য অংশ পাচ্ছে না। ১৯২৫ সালে রেজা শাহ ক্ষমতায় আসেন। তিনি রাষ্ট্রকে আধুনিক করার চেষ্টা শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে রেজা শাহ পুরোনো ব্যবস্থার বদলে নতুন তেলচুক্তি করেন। এতে কিছু শর্ত সংশোধন হলেও ইরানের অনেকের কাছে তা যথেষ্ট মনে হয়নি। বিদেশি কোম্পানির প্রভাব থেকেই যায়। ১৯৩৫ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘পারস্য’-এর বদলে ‘ইরান’ নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে বেশি ব্যবহৃত হতে শুরু করে। পরে কোম্পানির নামেও পরিবর্তন করা হয়।

তেলের গল্প ১ : এক কূপ যেভাবে বদলে দিল পৃথিবীতেলের গল্প ২ : যেভাবে দুই বিশ্ব তেলযুদ্ধ বদলে দিল বিশ্বের মানচিত্রতেলের গল্প ৩ : পাওয়া গেল সৌদি তেল, এরপর ঢুকল রাজনীতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইরান কেন গুরুত্বপূর্ণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইরানের গুরুত্ব হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায় আর এর কেন্দ্রে ছিল তেল ও ভূগোল। বিশেষ করে ইরানের আবাদান রিফাইনারি ব্রিটেনের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ নৌবাহিনী তখন কয়লা থেকে তেলে রূপান্তরিত হচ্ছে। তাই ব্রিটেন কোনোভাবেই চায়নি, এই তেলক্ষেত্র জার্মানির প্রভাবের আওতায় চলে যাক।
একই সময় ইরানের ভূগোলও তাকে যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বানিয়ে তোলে। ১৯৪১ সালে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ করার পর মিত্রশক্তির জন্য সোভিয়েতদের সহায়তা পাঠানো জরুরি হয়ে পড়ে। সমুদ্রপথে অনেক ঝুঁকি থাকায় ইরান হয়ে একটি স্থল ও আংশিক জলপথের করিডর তৈরি করা হয়, যা পরে ‘পার্সিয়ান করিডর’ নামে পরিচিত হয়। এই পথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সোভিয়েত ইউনিয়নে অস্ত্র, যানবাহন, খাদ্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠাতে থাকে।

তবে সমস্যা তৈরি হয় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। ইরানের শাসক রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে জার্মান প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি বেশি ছিল। তখন ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সন্দেহ করতে থাকে যে এতে জার্মানির প্রভাব বাড়ানোর পথ তৈরি হবে। এ জন্য তারা ইরানকে জার্মান নাগরিকদের বহিষ্কার করতে বলে। কিন্তু রেজা শাহ এতে রাজি হননি।

রেজা শাহ পাহলভি

১৯৪১ সালের ২৫ আগস্ট ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী ইরানে আক্রমণ চালায়। ব্রিটিশরা দক্ষিণ দিক থেকে, বিশেষ করে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল ও আবাদান ঘিরে অগ্রসর হয় আর সোভিয়েতরা উত্তর দিক থেকে প্রবেশ করে। ইরানের সেনাবাহিনী খুব বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি এবং দ্রুত দেশটির বড় অংশ মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই সামরিক চাপের মুখে রেজা শাহ ১৯৪১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ তিনি সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর ক্ষমতায় আসেন তাঁরই মাত্র ২২ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। এরপর ইরান কার্যত মিত্রশক্তির একটি সরবরাহ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। দেশের রেলপথ, সড়ক, বন্দর এবং তেল অবকাঠামো ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধসামগ্রী পাঠানো হয়।

ইরানে ব্রিটিশ তেল কোম্পানির নামনে বিক্ষোভ

এ ঘটনার ফলে ইরান রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ছিল না; বরং জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। ইরানে ক্রমে এই ধারণা শক্তিশালী হয় যে তেল দেশের হলেও তার ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ বিদেশিদের হাতে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জোর বাড়তে থাকে। বিদেশি প্রভাব কমানো এবং তেলের ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনৈতিক শক্তিগুলো আরও সংগঠিত হয়। এই সময় মোহাম্মদ মোসাদ্দেক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৫১ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর জনপ্রিয়তার বড় ভিত্তি ছিল একটি সহজ, কিন্তু শক্তিশালী দাবি আর তা হলো ইরানের তেল ইরানের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

মোসাদ্দেকের উত্থান ও ষড়যন্ত্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানে নতুন এক নেতা হিসেবে উঠে আসেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম তাঁকে অদ্ভুত, আবেগপ্রবণ এক বৃদ্ধ হিসেবে দেখালেও বাস্তবে তিনি ছিলেন ধনী জমিদার পরিবারের শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান রাজনীতিক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ইরানের মানুষের মধ্যে বিদেশি তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

মোহাম্মদ মোসাদ্দেক

মোসাদ্দেক তেলনীতিবিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ারম্যান হন। এই কমিটি বলে যে বিপির সঙ্গে করা চুক্তি ইরানের জন্য ন্যায্য নয়। একই সময় সৌদি আরবে আরামকোর ৫০-৫০ মুনাফা ভাগাভাগির খবর ইরানে চাপ বাড়ায়। এরপর ঘটনাগুলো দ্রুত বদলাতে থাকে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাজ আলী রজমারা ছিলেন সেনাবাহিনী থেকে উঠে আসা একজন প্রশাসক। তিনি ইরানের তেল জাতীয়করণের পক্ষে ছিলেন না। তাঁর যুক্তি ছিল, ইরান তখনো নিজে নিজে তেলশিল্প চালানোর মতো প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারেনি। তাই হঠাৎ করে ব্রিটিশ কোম্পানির চুক্তি বাতিল করলে ইরান বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। এই অবস্থান তাঁকে জাতীয়তাবাদীদের চোখে ব্রিটিশপন্থী করে তোলে। মোসাদ্দেক ও তাঁর অনুসারীরা মনে করতেন, রজমারা আসলে ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষা করছেন। অন্যদিকে ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংগঠন ফেদায়ানে ইসলামও তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

১৯৫১ সালের ৭ মার্চ রজমারা তেহরানের শাহ মসজিদে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান। সেখানেই খলিল তাহমাসেবি নামের ফেদায়ানে ইসলামের এক সদস্য তাঁকে গুলি করেন। গুলিতে রজমারা গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। এতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধর্মঘট, অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের মধ্যে ইরানের পার্লামেন্ট (মাজলিস) মোসাদ্দেককে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে। একই সঙ্গে তেল জাতীয়করণের পক্ষে ভোট দেয় এবং ব্রিটিশ কোম্পানির তেলক্ষেত্র জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয়।
ব্রিটেনে তখন ক্লেমেন্ট অ্যাটলির নেতৃত্বে লেবার সরকার ক্ষমতায়। তারা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে, তারা কি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে? ব্রিটিশ সরকারের ভেতরেই মতভেদ তৈরি হয়। এই সময় ব্রিটেনও বুঝতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া তারা বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান জানিয়ে দেন, তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে নন। ফলে তখন ব্রিটিশ সরকার শক্তি প্রয়োগ থেকে সরে আসে।

১৯৫১ সালে ইরানের পার্লামেন্ট তেলশিল্প জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল ইরানের ইতিহাসে এক বড় ঘটনা। বহু মানুষের চোখে এটি ছিল বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয় মর্যাদার পদক্ষেপ। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সহজে মেনে নেয়নি ব্রিটেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে তারা অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়ায়। তেল কোম্পানিগুলো ইরানের তেল বর্জন করে। ফলে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৯৫৩ সালের মে মাসে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারকে চিঠি লিখে অভিযোগ করেন, ব্রিটিশ সরকার ও বিপির (ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম) রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তিনি সাহায্য চান। কিন্তু এক মাস পর আইজেনহাওয়ারের জবাব আসে, ইরানকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও দায়বদ্ধতা মেনে চলতে হবে। এই উত্তর মোসাদ্দেককে হতাশ করে।

অনেক পরে প্রকাশিত মার্কিন নথি ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের দলিল দেখায় যে এই অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও যুক্তরাজ্যের এমআই-৬–এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল

অভ্যুত্থানের পেছনে সিআইএ

তখন ইরানের পরিস্থিতি খুব কঠিন ছিল। তেল জাতীয়করণের পর ইরান নিজের তেল বিদেশে বিক্রি করতে পারছিল না। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছিল, ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়ছিল। এই সুযোগে আড়ালে নানা শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জানায়, ইরানে অনেক মোসাদ্দেকবিরোধী গোষ্ঠী আছে, যাদের অর্থ ও সমর্থন দিলে তারা তাঁকে সরাতে পারে। শুরুতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেন এই পরিকল্পনায় অনুমতি দেননি। পরে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) কাছে যায়। অবশেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের অনুমোদনে গোপন পরিকল্পনা এগোয়।

মোসাদ্দেককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সিআইএর গোপন নথি

অনেক পরে প্রকাশিত মার্কিন নথি ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের দলিল দেখায় যে এই অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও যুক্তরাজ্যের এমআই-৬–এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথম দিকে ব্রিটিশ সরকার চেয়েছিল, শাহ যেন পার্লামেন্টে আদেশের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে সরিয়ে দেন, কিন্তু সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। উল্টো এতে মোসাদ্দেকের জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং শাহর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পরিকল্পনা আরও কঠোর রূপ নেয়। শুধু সরকারপ্রধানকে সরানো নয়, পুরো সরকার উৎখাতের পথ বেছে নেওয়া হয়। তবে ব্রিটেন একা এ দায়িত্ব নিতে চাইছিল না। তাই ঠান্ডা যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সামনে এনে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করায়।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র গোপন অভিযানে প্রধান ভূমিকা নেয়। এই অভিযানের নাম ছিল অপারেশন আজাক্স। প্রেসিডেন্ট আইজেনআওয়ার এই পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেন। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কয়েক দিনের ঘটনাগুলো ছিল এ রকম—

১৫ আগস্ট ১৯৫৩: শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি একটি ফরমান বা রাজকীয় আদেশে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করেন এবং জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। শাহর অনুগত ইম্পিরিয়াল গার্ডের কমান্ডার কর্নেল নেমাতুল্লাহ নাসিরি রাতের অন্ধকারে মোসাদ্দেকের বাড়িতে সেই আদেশ পৌঁছে দিতে যান। কিন্তু মোসাদ্দেক আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন। তিনি আদেশ মানতে অস্বীকার করেন এবং নাসিরিকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথম দফার অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়।
১৬ আগস্ট: পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় শাহ ভয় পেয়ে দেশ ছাড়েন। তিনি প্রথমে বাগদাদে যান, পরে রোমে আশ্রয় নেন। মোসাদ্দেক রেডিওতে ঘোষণা করেন, রাজতন্ত্রপন্থী একটি অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা রাস্তায় নামে। তেহরানে শাহবিরোধী স্লোগান ওঠে, শাহর ভাস্কর্য ভাঙা হয়।

মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করার রাজকীয় আদেশ

১৭-১৮ আগস্ট: এই দুই দিন পরিস্থিতি খুব অনিশ্চিত ছিল। অনেকের ধারণা হয়েছিল, মোসাদ্দেক জিতে গেছেন। জেনারেল জাহেদি আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু সিআইএ গোপনে কাজ চালিয়ে যায়। শাহপন্থী রাজনীতিক, ধর্মীয় নেতা, সেনা কর্মকর্তা, বাজারের প্রভাবশালী লোক এবং ভাড়া করা দাঙ্গাবাজদের সংগঠিত করা হয়। লক্ষ্য ছিল, রাস্তায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে মনে হয় জনগণ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়িয়েছে।

শাহপন্থীদের মিছিল

১৯ আগস্ট: সকাল থেকে তেহরানে শাহপন্থী মিছিল শুরু হয়। ভাড়া করা লোকজন, কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী, বাজারের লোক, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অংশ একসঙ্গে রাস্তায় নামে। তারা শাহর নামে স্লোগান দিয়ে সরকারি ভবন, সংবাদপত্র অফিস, রেডিও স্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখলের চেষ্টা শুরু হয়। দুপুরের পর সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট প্রকাশ্যে মোসাদ্দেকবিরোধী পক্ষ নেয়। তেহরানের রেডিও স্টেশন দখল করা হয় এবং জাহেদিকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট সকাল থেকেই শাহপন্থী পুলিশ, সেনা ইউনিট ও গোপন এজেন্টরা সক্রিয়ভাবে অভ্যুত্থানে যুক্ত হয়।

শেষে মোসাদ্দেকের বাড়ি ঘিরে ফেলা হয়। তাঁর অনুগত বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। কয়েক ঘণ্টার লড়াইয়ের পর মোসাদ্দেক পালিয়ে যান, পরে আত্মসমর্পণ করেন। জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদি ক্ষমতা নেন। শাহ কয়েক দিনের মধ্যে দেশে ফিরে আসেন। এই গোপন অভিযানে সিআইএর প্রায় ৭ লাখ ডলার খরচ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

লুট করা হয় মোসাদ্দেকের সম্পদ

ঘটনাটি ছিল একটি সুসংগঠিত অভ্যুত্থান, যা পরে সিআইএকে অন্য দেশেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ দেয়। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ছিল। শাহ এরপর নিজেকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং পশ্চিমাদের পুতুল হিসেবে দেখাতে চাননি।

অভ্যুত্থানের পর তেল কোম্পানিগুলোর আবার ইরানে ফেরার পথ খুলে যায়। কিন্তু একই সঙ্গে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল রাজনীতি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে তাদের মধ্যে সমন্বিত নীতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অভ্যুত্থানের পর মোসাদ্দেককে তিন বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর জীবনের বাকি সময় তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। এখন সাধারণভাবে মনে করা হয়, ১৯৫৩ সালের এই অভ্যুত্থানই পরে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করে। সেই বিপ্লবে শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। ২০১৩ সালে সিআইএ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে, এই অভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকা ছিল।

ইরানের তেল-রাজনীতির গল্প কিন্তু কখনো থেমে থাকেনি। ইরানকে বর্জন করার সময় অন্য উৎপাদক দেশগুলোও লাভবান হয়েছিল। পরে তারা এ নিয়ে লজ্জা বোধ করে। ছয় বছর পর যখন ওপেক গঠিত হয়, সদস্যরা ঠিক করে যে আর কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিপদে এমন সুযোগ নেবে না।

অভ্যুত্থানের পর ইরান

১৯৫৩ সালের এই অভ্যুত্থান ইরানের মানুষের মনে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ সৃষ্টি করে। কারণ, অনেক ইরানির কাছে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ছিলেন জাতীয় মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া মানে ছিল ইরানের জাতীয় ইচ্ছাশক্তিকেই আঘাত করা। এই অভ্যুত্থানের পর শাহর অধীনে বহু বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে আমেরিকাকে গণতন্ত্রের পক্ষে নয়, বরং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পক্ষে বলেই দেখা হয়। ইরানে মার্কিন বিরোধিতা শুরু তখন থেকেই, যা নানা ঘটনাপ্রবাহে পরে আরও তীব্র হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সঙ্গে ইরানের শাহ

অভ্যুত্থানের পরের বছর, ১৯৫৪ সালে ইরানের তেলশিল্পে পশ্চিমা বহুজাতিক কনসোর্টিয়াম তৈরি হয়, যার নেতৃত্বে ছিল ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। মোসাদ্দেককে সরানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল—দুই বছর ধরে বিশ্ববাজারের বাইরে থাকা ইরানের তেল কীভাবে আবার বাজারে ফেরানো যাবে। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে, যাতে দাম ভেঙে না পড়ে। এই লক্ষ্যেই ১৯৫৪ সালে পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোকে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়। এর কাজ ছিল পরিকল্পিতভাবে ইরানের তেল আবার বিশ্ববাজারে আনা।

তবে এটি শুধু ব্যবসার সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল রাজনৈতিকও। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য চাইছিল, ইরানের তেল উৎপাদন আবার শুরু হোক, দেশটি স্থিতিশীল থাকুক আর মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা স্বার্থও অক্ষুণ্ন থাকুক। কিন্তু মার্কিন বড় তেল কোম্পানিগুলোর অনেকেই শুরুতে আগ্রহী ছিল না। তাদের ধারণা ছিল, সৌদি আরবেই যথেষ্ট তেল আছে; ইরানের অস্থির রাজনীতিতে জড়ানোর দরকার নেই।

নতুন ব্যবস্থায় ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, পাঁচটি বড় মার্কিন কোম্পানি, রয়্যাল ডাচ/শেল ও একটি ফরাসি কোম্পানি অংশ নেয়। এতে ইরানের তেল আবার বাজারে ফেরে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর হাতেই থেকে যায়। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এটি ছিল সস্তা ও স্থিতিশীল তেলের ব্যবস্থা আর ইরানের জন্য ছিল সীমিত অর্থনৈতিক লাভের বিনিময়ে দীর্ঘ বিদেশি প্রভাবের ধারাবাহিকতা।

আরও বড় বিষয় হলো, এই কনসোর্টিয়াম দেখিয়ে দেয় যে যুদ্ধপরবর্তী বিশ্বে তেল আর শুধু পণ্য ছিল না, এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

ইরানের তেল-রাজনীতির গল্প কিন্তু কখনো থেমে থাকেনি। ইরানকে বর্জন করার সময় অন্য উৎপাদক দেশগুলোও লাভবান হয়েছিল। পরে তারা এ নিয়ে লজ্জা বোধ করে। ছয় বছর পর যখন ওপেক গঠিত হয়, সদস্যরা ঠিক করে যে আর কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিপদে এমন সুযোগ নেবে না।

১৯৬০ সালে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলা মিলে ওপেক গঠন করে। এর অর্থ ছিল, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো পশ্চিমা তেল কোম্পানির একচ্ছত্র প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইছিল। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৭০-এর শুরুর দিকে শাহ তেলের আয়ের ওপর ভর করে রাষ্ট্রপরিচালনা, আধুনিকীকরণ ও নিরাপত্তাকাঠামো জোরদার করেন।

কিন্তু তেলসম্পদ রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি। ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে তেল–শ্রমিকদের ধর্মঘট ইরানের তেলশিল্প প্রায় থামিয়ে দেয়। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব হয়, শাহর পতন ঘটে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর তেল খাত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় থেকে গেলেও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে থাকে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে তেল অবকাঠামো, টার্মিনাল ও রপ্তানি বড় আঘাতের মুখে পড়ে। খারগ দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হামলার শিকার হয়।
১৯৯০-এর দশকে ইরান পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও ভূরাজনৈতিক বাধা তেল খাতের পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেয়নি। ২০০০-এর দশকে পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন এক যুগ শুরু হয়—নিষেধাজ্ঞার যুগ। তেল তখন একদিকে ইরানের প্রধান আয়-উৎস, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপেরও কেন্দ্র।

সেভেন সিস্টার্স: তেলের দুনিয়ায় করপোরেট সাম্রাজ্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দ্রুত কয়লা থেকে তেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। গাড়ির বিস্তার, মহাসড়ক নির্মাণ, বিমান চলাচল, ভারী শিল্প, রাসায়নিক পণ্য—-সব মিলিয়ে তেল হয়ে ওঠে আধুনিক অর্থনীতির প্রধান জ্বালানি। এই নতুন তেল যুগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব বিস্তার করে পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি বিশাল তেল কোম্পানি। ইতালির জ্বালানি উদ্যোক্তা এনরিকো মাত্তেই ব্যঙ্গ করে তাঁদের নাম দিয়েছিলেন ‘সেভেন সিস্টার্স’। পরে এই নামই ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়।

এই সাত কোম্পানি ছিল—স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউইয়র্ক, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাকো, গালফ অয়েল, অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি ও রয়্যাল ডাচ শেল। নাম আলাদা হলেও, বিশ্ব তেলব্যবস্থায় তাদের শক্তি ছিল প্রায় একচ্ছত্র। তারা শুধু তেল তুলত না—তেল অনুসন্ধান, উৎপাদন, পরিবহন, পরিশোধন, বিপণন—সবকিছুর ওপরই তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল।

প্রসঙ্গত, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি পরে এক্সন নামে পরিচিত হয় এবং স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউইয়র্কের (মোবিল) সঙ্গে একীভূত হয়ে আজকের এক্সনমোবিল হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়া পর শেভরন নামে পরিচিত হয়। টেক্সাকো ২০০১ সালে শেভরনের সঙ্গে মিশে যায়। গালফ অয়েলের বড় অংশও পরে শেভরন অধিগ্রহণ করে। ফলে এই তিন কোম্পানি মিলেই এখনকার শেভরন।

অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি পরে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপি নামে পরিচিত হয়, যা আজও সেই নামেই বড় তেল কোম্পানি হিসেবে আছে। অন্যদিকে রয়্যাল ডাচ শেল এখন শুধু শেল নামে পরিচিত, এটি এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় তেল কোম্পানি। সব মিলিয়ে বলা যায়, আগের সাতটি বড় কোম্পানি এখন মূলত চারটি বড় বৈশ্বিক তেল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। যেমন এক্সনমোবিল, শেভরন, বিপি ও শেল।

আগের সময়ে ফিরে যাই। অনেক তেলসমৃদ্ধ দেশ তখন সদ্য স্বাধীন, দরিদ্র কিংবা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। প্রযুক্তি নেই, পুঁজি নেই, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথও সীমিত। এতে পশ্চিমা বড় কোম্পানিগুলোই হয়ে ওঠে তেলসম্পদের প্রধান নিয়ন্ত্রক। অনেকের কাছে তারা ছিল ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র’।

এই শক্তিশালী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে কজন প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন এনরিকো মাত্তেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁকে ইতালির রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা এজিপ গুটিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি উল্টো পথ নেন। উত্তর ইতালির প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদকে ভিত্তি করে তিনি সংস্থাটিকে টিকিয়ে রাখেন, বিস্তৃত করেন, পরে গড়ে তোলেন ইএনআই।

এনরিকো মাত্তেই

মাত্তেই দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন, তেলের বাজার শুধু ব্যবসার বাজার নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব, রাষ্ট্রীয় শক্তি ও কূটনৈতিক দর-কষাকষিরও ক্ষেত্র। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইতালিকে জ্বালানির প্রশ্নে কম নির্ভরশীল করা আর একই সঙ্গে পশ্চিমা তেল জায়ান্টদের একচেটিয়া কর্তৃত্বে ফাটল ধরানো। মাত্তেইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, তিনি প্রচলিত নিয়ম মেনে চলতে চাননি। সে সময় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে বড় কোম্পানিগুলোর চুক্তিতে সাধারণত ৫০-৫০ মুনাফা ভাগাভাগির কথা থাকত। মাত্তেই এর চেয়ে ভালো শর্ত দেওয়ার প্রস্তাব দেন। বিশেষ করে ইরান ও অন্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি করেন, যেখানে উৎপাদনকারী দেশগুলোর অংশ বাড়ে এবং তারা আগের তুলনায় বেশি নিয়ন্ত্রণ পায়।

এখানেই মাত্তেইয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। তিনি শুধু বেশি অর্থ দেওয়ার কথা বলেননি; তিনি তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, পশ্চিমা বড় কোম্পানিগুলোই শেষ কথা নয়; চাইলে ভিন্ন শর্তে, বেশি মর্যাদা নিয়ে, বেশি অংশ নিয়ে চুক্তি করা যায়। মাত্তেই এই বার্তাও দিতে পেরেছিলেন যে ইতালি ব্রিটেন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুরোনো ঔপনিবেশিক শক্তি নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও নতুন স্বাধীন দেশগুলোর কাছে তিনি একধরনের বিকল্প অংশীদার হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন।

মাত্তেইয়ের উত্থান বড় তেল কোম্পানিগুলোর কাছে শুধু ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল একধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও। কারণ, তিনি দেখাচ্ছিলেন, উৎপাদনকারী দেশগুলোকে বেশি সুবিধা দিয়েও বাজারে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। তাঁর সাফল্য অন্য দেশগুলোকে সাহস দিচ্ছিল পুরোনো শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে।
১৯৬২ সালে বিমান দুর্ঘটনায় মাত্তেই মারা যান। তাঁর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা জল্পনা আছে। অনেকেই সন্দেহ করেছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না। তবে নাশকতার অভিযোগ কখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে তাঁর মৃত্যু ঘিরে রহস্য আজও পুরোপুরি কাটেনি।

ওপেকের জন্ম

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কে ঠিক করবে? উৎপাদনকারী দেশ নাকি বড় পশ্চিমা কোম্পানি—এই প্রশ্ন থেকেই ওপেকের জন্ম। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় তেল কোম্পানিগুলো বারবার একতরফাভাবে দাম কমাতে থাকে। এতে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর আয় কমে যায়। তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। কারণ, তেল ছিল তাদের মাটির নিচে, কিন্তু তার দাম ও মুনাফার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল অন্যের হাতে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে একজোট হওয়ার চিন্তা সামনে আনেন ভেনেজুয়েলার হুয়ান পাবলো পেরেজ আলফোনসো এবং সৌদি আরবের আবদুল্লাহ আল-তারিকি। তাঁরা বুঝতে পারেন, আলাদা আলাদা প্রতিবাদে কাজ হবে না। দরকার এমন একটি স্থায়ী জোট, যেখানে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ নিয়ে একসঙ্গে কথা বলতে পারবে। ১৯৫৯ সালে কায়রোয় আরব পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসের ফাঁকে কয়েকজন প্রতিনিধি অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকে বসেন। সেখানেই ভবিষ্যৎ জোটের বীজ রোপিত হয়। তেলবিষয়ক প্রভাবশালী সাংবাদিক ওয়ান্ডা ইয়াবলনস্কিও এই যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

জন্ম নিচ্ছে ওপেক

কিন্তু কায়রোর ওই সমঝোতার পরও বড় কোম্পানিগুলোর আচরণ বদলায়নি। ১৯৬০ সালের আগস্টে তাদের আবারও তেলের পোস্টেড প্রাইস নির্ধারণ (তেলের ঘোষিত দাম। এই দামের ভিত্তিতে উৎপাদনকারী দেশের পাওনা, কর বা মুনাফার ভাগ হিসাব করা হতো।)—এটাই ছিল শেষ ধাক্কা। উৎপাদনকারী দেশগুলো বুঝে যায়, আর অপেক্ষা করলে চলবে না। এরপর ১৯৬০ সালের ১০ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ইরাকের বাগদাদে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলা একত্র হয়। সেখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম নেয় ওপেক; অর্থাৎ অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ।

শুরুর দিকে অনেকে ওপেককে খুব গুরুত্ব দেয়নি। বড় তেল কোম্পানিগুলো ভেবেছিল, উৎপাদনকারী দেশগুলোর এই ঐক্য বেশি দিন টিকবে না। কিন্তু বাস্তবে ওপেক ছিল একটি বড় মোড়বদল। এই সংগঠন প্রথমবার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে একটি স্থায়ী যৌথ প্ল্যাটফর্ম দেয়। এখান থেকে তারা বাজার, উৎপাদন ও দামের প্রশ্নে সম্মিলিত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পায়। পরে ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ওপেকের প্রভাবই দেখিয়ে দেয়, বাগদাদের সেই সিদ্ধান্ত কত বড় ছিল।

গাদ্দাফির এক সিদ্ধান্ত

লিবিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে তেল আবিষ্কার হয় ১৯৫৯ সালে। এরপর খুব দ্রুত দেশটি ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। কারণ, লিবিয়ার তেল ছিল তুলনামূলক ভালো মানের—ইউরোপের কাছাকাছি আর ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সুয়েজ খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভূমধ্যসাগরমুখী সরবরাহের মূল্য আরও বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে ১৯৬০-এর দশকে লিবিয়া আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি

আরমান্ড হ্যামার ছিলেন অক্সিডেন্টাল পেট্রোলিয়ামের প্রধান। তাঁর হাতে কোম্পানিটি ছোট অবস্থা থেকে বড় হয়ে ওঠে। অক্সিডেন্টাল ১৯৬৫ সালে লিবিয়ায় তেল অনুসন্ধানের কাজ পায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে তেল পেয়ে যায়। এর কয়েক বছরের মধ্যেই অক্সিডেন্টাল ইউরোপে বড় সরবরাহকারীতে পরিণত হয়।

১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির নেতৃত্বে লিবিয়ায় রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান হয় এবং রাজা ইদ্রিসের শাসনের অবসান ঘটে। অভ্যুত্থানের পর বড় কোম্পানিগুলোর আধিপত্যের যুগ দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। গাদ্দাফি বুঝতে পারেন, বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের যুগ শেষ হয়ে আসছে। তখন তিনি লিবিয়ায় কাজ করা স্বাধীন কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বাড়ান। বিশেষ করে তিনি আরমান্ড হ্যামারের অক্সিডেন্টালকে নিশানা করেন। কারণ, কোম্পানিটি পুরোপুরি লিবিয়ার তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

এই দর-কষাকষির ফল ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। হ্যামার শেষ পর্যন্ত প্রতি ব্যারেলে ৩০ সেন্ট বেশি দিতে এবং উচ্চতর করহার মানতে রাজি হন; পরে অন্য কোম্পানিগুলোকেও সেই পথ ধরতে হয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। এখানেই প্রথম স্পষ্ট হয়, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির হাত থেকে ক্ষমতা উৎপাদনকারী দেশগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে।

এই ঘটনাই দেখায়, তেলের দুনিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে শুরু করেছে। আগে কোম্পানিগুলো দাম ও শর্ত অনেকটাই নিজেদের মতো ঠিক করত। কিন্তু লিবিয়া দেখাল, উৎপাদনকারী দেশ চাইলে সরবরাহ কমানো, চাপ তৈরি করা এবং বাজারের অবস্থান কাজে লাগিয়ে শর্ত বদলে দিতে পারে। পরে এই লিবীয় উদাহরণ অন্য উৎপাদনকারী দেশগুলোকেও সাহস দেয়।

১৯৭৩: পেট্রোডলার ও তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার

১৯৭৩ সাল বিশ্বরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো বছর। ওই বছর প্রথমবার এত স্পষ্টভাবে দেখা গেল যে তেল শুধু শিল্পকারখানা চালানোর জ্বালানি নয়, এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্রও। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পটভূমিতে আরব তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তেলের প্রবাহ কমিয়ে দেয়। এতে হঠাৎ করেই বিশ্ব বুঝতে পারে, তেল সরবরাহে ধাক্কা লাগলে শুধু পাম্পে লাইন পড়ে না, পুরো অর্থনীতিই কেঁপে ওঠে।

একটু পুরোনো সময়ে ফিরে যেতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আগে বিশ্বের সব মুদ্রার মূল্যমানই সোনার সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে বাঁধা বা যুক্ত ছিল, এই ব্যবস্থাকে বলা হতো গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো, যুদ্ধের খরচ মেটাতে মজুত সোনা খরচ করে ফেলে। ফলে নিজেদের মুদ্রাকে সমর্থন দেওয়ার মতো সোনা আর তেমন ছিল না।

তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই ছিল বিশ্বের মোট সোনার সরবরাহের ৭০ শতাংশ। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালে ৪৪টি দেশ নিজেদের মুদ্রাকে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের সঙ্গে বেঁধে রাখতে সম্মত হয় আর যুক্তরাষ্ট্রের ডলার বাঁধা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের সোনার রিজার্ভের সঙ্গে। এই ব্যবস্থার নামই ব্রেটন উডস ব্যবস্থা।

এতেই যুক্তরাষ্ট্রের ডলার বৈশ্বিক মুদ্রা হয়ে ওঠে। তবে বিষয়টা সহজ ছিল না। কারণ, ডলার ছাপাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি সোনার দরকার পড়ল। যুক্তরাষ্ট্র তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চলছে ঠান্ডা যুদ্ধ। বিনিয়োগের চাহিদাও প্রচুর। এতে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ দরকার ছিল, কিন্তু তারা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছিল না।

তাই ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেই ব্যবস্থা থেকে একতরফাভাবে হঠাৎ বের হয়ে আসেন। ঘোষণাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে এটাকে বলা হয় নিক্সন শক। এর মানে হলো, এর পর থেকে ডলারের বিপরীতে সোনা রাখার বাধ্যবাধকতা আর থাকল না। ফলে অনেক সহজে ডলার ছাপাতে পারল।

তখন প্রশ্ন উঠল—সোনা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও কেন বিশ্ব ডলার ব্যবহার করবে? কিন্তু দেখা গেল, ডলার আরও শক্তিশালী হয় উঠেছে। সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যও রাজনৈতিকভাবে ভালো অবস্থায় ছিল না। ইয়োম কিপুর বা আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হচ্ছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিসর ও সিরিয়ার নেতৃত্বে আরব রাষ্ট্রগুলোর যুদ্ধ। ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর শুরু হয়ে এই যুদ্ধ শেষ হয়েছিল ২৫ অক্টোবর।

এই যুদ্ধে সৌদি আরব এবং বেশির ভাগ আরব তেলসমৃদ্ধ দেশ মিসর ও সিরিয়াকে সমর্থন করে আর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবসহ অন্যরা পশ্চিমাদের কাছে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এই তেল অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেয়। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২ দশমিক ৯০ ডলার থেকে ১১ দশমিক ৬৫ ডলারে উঠে যায়। পশ্চিমা দেশগুলো তখন বুঝে যায়, মধ্যপ্রাচ্যের তেল আর শুধু বাজারের পণ্য নয়; এটি ভূরাজনীতিরও একটি হাতিয়ার।

অন্যদিকে সৌদি আরব ও অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশ তেল থেকে বিপুল ডলার আয় করতে থাকে। তখন প্রশ্ন হলো, এই ডলার কোথায় যাবে, ডলার নিয়ে তারা কী করবে। এখানেই আসে পেট্রোডলার নামের গোপন চুক্তি বা সমঝোতার বিষয়টি।
১৯৭৪ সালের ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম সায়মন সৌদি আরব সফরে যান। তিনি তেল ও বন্ড বাজারের একজন খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ ছিলেন। সে সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে গোপন সমঝোতা বা চুক্তিটি হয়। সেটিকেই বলা হয় পেট্রোডলার চুক্তি বা সমঝোতা। যদিও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক সরকারি কোনো বিবৃতি বা নথি নেই। তবে ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে জয়েন্ট কমিশন অন ইকোনমিক কো–অপারেশন নামের যে প্রাতিষ্ঠানিক সমঝোতার দলিল পাওয়া যায়, সেখান থেকে পেট্রোডলারের কথা জানা যায়। এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন সে সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। তিনিও গোপনে মধ্যপ্রাচ্য সফর করেছিলেন বলে জানা যায়।

হেনরি কিসিঞ্জার

এই সমঝোতায় তিনটি বিষয় ছিল। যেমন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সামরিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমর্থন দেবে, সৌদি আরব তেল ডলারে বিক্রি করবে এবং তেল বিক্রি করে যে ডলার পাবে, তার বড় অংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হবে। এটাকেই বলে পেট্রোডলার রিসাইক্লিং।

পেট্রোডলার রিসাইক্লিং ব্যবস্থার বড় সুবিধা তিনটি। যেমন বিশ্বে তেল কিনতে ডলার দরকার, তাই ডলারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী থাকল। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো সেই ডলার আবার মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করায় যুক্তরাষ্ট্র কম খরচে ঋণ নিতে পারল। ডলার যেহেতু আন্তর্জাতিক লেনদেনের কেন্দ্র, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতাও বেড়ে গেল।

এই কারণেই পেট্রোডলার শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষমতার ব্যবস্থাও। আর এ কারণেই কোনো দেশের কাছে তেল থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রতি খুব আগ্রহী মনে হয়।

সংক্ষেপে, ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ বিশ্বকে দুটি জিনিস শিখিয়েছিল। প্রথমত, তেলকে প্রয়োজনে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দ্বিতীয়ত, তেলবাণিজ্য থেকে আসা ডলার শুধু রপ্তানিকারক দেশগুলোর আয় নয়; সেটি বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষমতারও ভিত্তি হতে পারে। এই দুই বাস্তবতাই পরে বিশ্ব অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রভাব—সবকিছু নতুনভাবে গড়ে দেয়।

সাদ্দাম হোসেন কেন কুয়েত আক্রমণ করেন

১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করেন মূলত অর্থনৈতিক হতাশা ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে। ইরান-ইরাকের আট বছরের যুদ্ধের পর ইরাকের ওপর ৭৫ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চাপে। তেলের দাম দ্রুত বাড়ানো তার জন্য জরুরি হয়ে ওঠে।

সাদ্দাম হোসেন

কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উৎপাদন কমাতে রাজি হচ্ছিল না। সাদ্দাম চাইছিলেন, দামের উল্লম্ফন ঘটুক। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান জোরদার করতে তিনি কুয়েতকে সহজ লক্ষ্য মনে করেন। কুয়েত দখল মানে আরও বড় তেল মজুতের নিয়ন্ত্রণ।

উপসাগরীয় যুদ্ধ দেখিয়ে দেয়, বিশ্ব এখনো এই অঞ্চলের তেলের ওপর কতটা নির্ভরশীল। ইরাকি বাহিনী সরে যাওয়ার সময় কুয়েতের তেলক্ষেত্রে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে আবারও স্পষ্ট হয়—যে সম্পদ সমৃদ্ধি আনে, সেটিই ধ্বংসেরও কারণ হতে পারে।

তেলের গল্প এখন নতুন অধ্যায়ে

এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে তেলের গল্প আমাদের দেখিয়েছে, এটি কখনোই শুধু জ্বালানি ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতা, রাজনীতি ও প্রভাবের এক জটিল খেলা। আজকের বিশ্বেও সেই বাস্তবতা বদলায়নি; বরং আরও জটিল হয়েছে।
ইরান ঘিরে চলমান সংঘাত আবারও প্রমাণ করেছে, মধ্যপ্রাচ্য এখনো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র। যুদ্ধের আশঙ্কা বা বাস্তব সংঘাত—দুটিই তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। একই সময়ে ওপেকের ভেতরের ঐক্যেও ফাটল দেখা যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এই সংকেতকে আরও স্পষ্ট করেছে যে উৎপাদনকারী দেশগুলোর স্বার্থ এখন আর এক নয়। সৌদি আরব ও রাশিয়ার নেতৃত্বে ওপেক প্লাস এখনো প্রভাবশালী, কিন্তু আগের মতো একক শক্তি হিসেবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে আরেকটি বড় পরিবর্তনও চলছে—জ্বালানি রূপান্তর। নবায়নযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, জলবায়ু নীতি—সবই তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্ব এখনো তেল ছাড়া ভালোভাবে চলতে শিখেনি। তাই তেলের গল্প এখনো শেষ হয়নি।
সূত্র: ১. ড্যানিয়েল ইয়ার্গিনের ‘দ্য প্রাইজ: দ্য এপিক কোয়েস্ট ফর অয়েল, মানি অ্যান্ড পাওয়ার’ আধুনিক তেলের ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলোর একটি। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৯২ সালে জেনারেল নন–ফিকশন বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার পায়। এই লেখার মূল সূত্র এই বই। সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আরও সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হালনাগাদ তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে।
২. অ্যান্থনি স্যাম্পসনের আরেক বিখ্যাত বই ‘দ্য সেভেন সিস্টার্স: দ্য গ্রেট অয়েল কোম্পানিজ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে শেইপড’।

Read full story at source