শিকলে বেঁধে নাতিকে নিয়ে টিসিবির ট্রাকের লাইনে নিরুপায় সালেহা বেগম
· Prothom Alo

রাজধানীর মিরপুরের সনি সিনেমা হলের সামনের দৃশ্যপট। এখানে সরকারের কম দামে ভোগ্যপণ্য বিক্রির ট্রাক আসার কথা। তাই আগেভাগেই অপেক্ষায় নিম্ন আয়ের মানুষ।
আজ মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ১৫ বছর বয়সী কিশোর সাইফুল ইসলামের পায়ে তালা দেওয়া একটি শিকল। সেটির অপর প্রান্ত ধরে আছেন সত্তরোর্ধ্ব সালেহা বেগম। তাঁরা এসেছেন টিসিবির ট্রাক থেকে তেল ও ডাল কিনতে।
Visit michezonews.co.za for more information.
সালেহা বেগম ও সাইফুল ইসলাম সম্পর্কে নানি–নাতি। সাইফুল ইসলাম জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। নিজে বুঝে চলতে পারে না। এ জন্য শিকল দিয়ে সব সময় বেঁধে রাখেন পরিবারের লোকজন। বাসায় সাইফুলকে সব সময় দেখে রাখার মতো লোক নেই। তাই নিরুপায় হয়ে নানি সালেহা বেগম সাইফুলকে নিয়েই সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকসেলের পণ্য কিনতে এসেছেন।
সালেহা বেগম মিরপুর–১ এলাকার একটি মেসে রান্নার কাজ করেন। এ কাজে তাঁর বড় মেয়ে সাহায্য করেন। ওই মেয়ের সন্তান সাইফুল। আর সালেহার স্বামী আমির হোসেন সবজির দোকানের কর্মচারী।
সালেহা বেগমের সঙ্গে সনি সিনেমা হলের সামনে আজ দুপুরে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ও স্বামী কাজ করে মাসে ২৫ হাজার টাকার মতো আয় করি। এ ছাড়া তিন মাস পরপর বয়স্ক ভাতার ১ হাজার ৯০০ টাকা পাই। এ টাকায় সংসার খরচ চলে না।’ তিনি কিছুটা আক্ষেপ করে বলেন, সুযোগ পেলেই কিছুটা সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাকের পেছনে দাঁড়ান। তাই আজও দাঁড়িয়েছেন।
সালেহা বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর সাইফুল পরিবারের কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে চিনতে পারে না। মনে রাখতে পারে না বাসার ঠিকানাও। এ পর্যন্ত তিনবার হারিয়ে গিয়েছিল সে। সবশেষ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজার দিনে মিরপুর–১ থেকে হারিয়ে যায়। পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে তাকে খুঁজে পায় পুলিশ। এ কারণে সাইফুলকে সব সময় পায়ে শিকল বেঁধে রাখেন নানি সালেহা বেগম।
টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে সাইফুলকে সঙ্গে নিয়ে আজ বেলা সাড়ে ১১টায় বাসা থেকে বের হন সালেহা বেগম। প্রথমে যান সরকারি বাঙলা কলেজের দিকে। সেখানে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে ট্রাকের খোঁজে পরে রিকশায় মিরপুর–২–এর দিকে রওনা হন। মিরপুর-২-এ যাওয়ার সময় সনি সিনেমা হলের সামনে মানুষের জটলা দেখে নামেন।
মিরপুরের সনি সিনেমা হলের সামনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যখন সালেহা বেগমের কথা হয়, তখন সময় বেলা একটা। তখনো সেখানে টিসিবির নির্ধারিত ট্রাকটি আসেনি। এ সময় সালেহা বেগমসহ সেখানে প্রায় আড়াই শ নারী–পুরুষ টিসিবির ট্রাকের অপেক্ষায় লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে বেলা দুইটা পর্যন্ত কোনো ট্রাক না আসায় কেউ কেউ হতাশা নিয়ে বাসায় ফিরে যান।
বেলা আড়াইটার দিকে টিসিবির অন্য একটি ট্রাক সনি সিনেমা হলের মোড় ঘুরে মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশনের বিপরীত পাশে থামে। এটি দেখে সনি সিনেমা হলের সামনে দাঁড়ানো সবাই সেদিকে ছুটতে থাকেন। মুহূর্তেই সকাল থেকে অপেক্ষায় থাকা মানুষের সারি এলোমেলো হয়ে যায়। শুরু হয় ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কি।
এই হুড়োহুড়ির কারণে শিকলে বেঁধে রাখা সাইফুলকে নিয়ে কিছু সময় পরে সেখানে উপস্থিত হন সালেহা বেগম। এ সময় বিপত্তি বাধে। তিনি সাইফুলকে নিয়ে না নারীদের সারিতে দাঁড়াতে পারছিলেন, না পারছিলেন পুরুষের সারিতে। নিরুপায় হয়ে ট্রাকের এক পাশে আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন। এ পর্যায়ে উপস্থিত লোকজনের অনুরোধে বিশেষ বিবেচনায় তাঁর কাছে লাইন ছাড়াই পণ্য বিক্রি করা হয়।
আজ মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশনের সামনে টিসিবির পণ্য বিক্রির ট্রাকের দৃশ্য। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর ১৫ বছর বয়সী সাইফুল ইসলামকে শিকল দিয়ে বেঁধে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছেন সত্তরোর্ধ্ব সালেহা বেগমপ্রথম আলোকে সালেহা বেগম বলেন, ‘বাসায় তেল (রান্নার) নেই। দোকান থেকে দুই লিটার নিলে ৪০০ টাকা লাগে। এখান থেকে নিলে ২৬০ টাকা লাগে। সব মিলিয়ে এখান থেকে ৪০০ টাকা কমে (তিনটি পণ্য—তেল, চিনি, ডাল) কেনা যায়। এ জন্যই এসেছি।’
সবশেষ গত পবিত্র রমজানে একবার টিসিবির তেল ও ডাল কিনেছিলেন সালেহা। এরপর আজ এসেছেন। তিনি জানান, শিকল ধরে বেশি সময় লাইনে দাঁড়ানো যায় না। আবার তাকে (সাইফুল) ছেড়েও দেওয়া যায় না। অনেক সময় মানবিক কারণে তাঁকে আগে (পণ্য) দিয়ে দেয়।
সনি সিনেমা হলের পাশের ফুটপাতে চা বিক্রি করেন সোলাইমান ইসলাম। তার দোকানের পাশেই সালেহা বেগম দাঁড়িয়েছিলেন। সোলাইমান ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই সাইফুল বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ওর নানীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে এখানে আসে। মাঝখানে হারিয়ে গিয়েছিল। এ জন্য শেকল দিয়ে বেধে রাখে।
সালেহা বেগম নিজেও অসুস্থ। কিছুদিন আগে কোমরে ব্যথা পেয়েছেন। এ জন্য ভারী কাজ করতে পারেন না। বিএনপি সরকারের ফ্যামিলি কার্ডের কথা শুনেছেন সালেহা। কিন্তু এই কার্ড কীভাবে দেয়, কারা দেয়, তার কিছুই জানেন না। কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে সালেহা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোগো ভাগ্য খারাপ। কাউকে বইল্লা তো লাভ নাই। যতক্ষণ পারি কষ্ট করি, তাতে দুগগা ভাত তো খাওয়া যায়। মাঝেমইধ্যে টান পড়লে টিসিবির ট্রাকের পিছে দাঁড়াই।’ বলেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।