নজরুলের উপন্যাসের নায়িকা মুর্তজা বশীরের তুলিতে
· Prothom Alo

মুর্তজা বশীর ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে বাংলা সাহিত্যের নায়িকাদের নিয়ে একটি সিরিজ চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন। বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশ টোব্যাকোর (বর্তমানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো) বর্ষপঞ্জির জন্য মুর্তজা বশীর এ দেশে জন্মগ্রহণকারী ১২ লেখকের বিখ্যাত উপন্যাসের ১২টি নায়িকার চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন।
মুর্তজা বশীরকে উপন্যাসগুলো পড়তে হয়েছিল এবং ১২টি নায়িকার চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে রীতিমতো গবেষণা করতে হয়েছিল। উপন্যাসগুলো ও তার নায়িকারা হলো কাজী ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহর ‘সালেহা’, নজিবর রহমানের আনোয়ারার ‘আনোয়ারা’, জহির রায়হানের হাজার বছর ধরের ‘টুনি’, আবুল মনসুর আহমদের জীবনক্ষুধার ‘বেগমসাহেবা’, মোজাম্মেল হকের জোহরার ‘জোহরা’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালুর ‘জমিলা’, হুমায়ুন কবিরের নদী ও নারীর ‘আমিনা’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির ‘কপিলা’, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের পদ্মরাগ-এর ‘সিদ্দিকা’, আবুল ফাত্তাহ কোরেশির সালেহার ‘সালেহা’, অদ্বৈতমল্ল বর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম-এর ‘বাসন্তি’ এবং ইসমাইল হোসেন সিরাজীর রায়নন্দিনীর ‘স্বর্ণময়ী’। মুর্তজা বশীর কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুক্ষুধার রুবিকেও এঁকেছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত হয়, যাঁরা এ দেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন, শুধু তাঁদের লেখা উপন্যাসের নারী চরিত্র নিয়ে চিত্রকর্মগুলো সম্পন্ন করা হবে। তাই মৃত্যুক্ষুধার রুবি চিত্রকর্মটি বাদ দেওয়া হয় এবং এর পরিবর্তে যোগ করা হয় অদ্বৈতমল্ল বর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম-এর ‘বাসন্তি’কে।
Visit newsbetsport.bond for more information.
কাজী নজরুল ইসলাম (২৫ মে ১৮৯৯—২৯ আগস্ট ১৯৭৬), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালকাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালের জানুয়ারি মাসে। কৃষ্ণনগরে অবস্থানকালে তিনি এ উপন্যাস রচনা করেন। এ উপন্যাসে কবির যাপিত জীবনের কিছু ঘটনা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অনেকখানি ছায়াপাত ঘটেছে। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের পটভূমি কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের এক বস্তি এলাকা।
মুর্তজা বশীরের ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ লেখকের বিখ্যাত উপন্যাসের ১২টি নায়িকার চিত্রকর্ম তিনি এঁকেছিলেন অ্যাক্রিলিক রং দিয়ে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিন্তাভাবনা করছিলেন, আবার ফিগারেটিভ কাজের দিকে ফিরে যাবেন। দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি ফিগারধর্মী ছবি আঁকেননি। মনের তাগিদ থেকে তিনি এই কাজ করেছেন। বাংলাদেশের যে ঐতিহ্য পাল যুগের চিত্রকলা, কালীঘাটের চিত্রকলা—এগুলোর ভেতর দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে মুর্তজা বশীর চিত্রকর্মগুলো করার চেষ্টা করেছেন। প্রথম থেকেই তাঁর পরিকল্পনা ছিল চিত্রকর্মগুলোতে তিনি ভিন্নমাত্রা যোগ করবেন। উপন্যাসে যে রকম আছে, তেমন না করে নতুনভাবে প্রকাশ করবেন। চিত্রকর্মগুলো নিয়ে তাঁকে প্রচুর খাটতে হয়েছে। প্রতিটি বই পড়া ছাড়াও উপন্যাসগুলো নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে, সেগুলোও পড়তে হয়েছে। প্রতিটি লেখার মূল নির্যাস অনুসন্ধান করতে হয়েছে। তিনি একটা কথা বলতে চেয়েছেন—উপন্যাসের অলংকরণ তিনি করেননি। তিনি একটি ক্রিয়েটিভ কাজের মতো চিত্রকর্মগুলোকে সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালের জানুয়ারি মাসে। কৃষ্ণনগরে অবস্থানকালে তিনি এ উপন্যাস রচনা করেন। এ উপন্যাসে কবির যাপিত জীবনের কিছু ঘটনা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অনেকখানি ছায়াপাত ঘটেছে। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের পটভূমি কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের এক বস্তি এলাকা। এখানে বাস করে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবার।
মুর্তজা বশীরগোফুর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘না, তা ঠিক নয়। রুবির সঙ্গে আমার মিল আছে। রুবিরও ছোটবেলায় একবার বিয়ে হয়েছিল, স্বামী এক মাসের মধ্যে মারা যায়। আমারও ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল, আট মাসের মধ্যে আমিও বিধবা হয়েছিলাম। রুবিরও আরেকবার বিয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছিল তার আপত্তি সত্ত্বেও। আমারও তখন বিয়ে দেবার চেষ্টা হচ্ছিল আমার আপত্তি সত্ত্বেও। রুবির মতো আমিও ছিলাম জেদি ও একগুঁয়ে। রুবির মতো আমারও বেপরোয়া ভাব ছিল।’
উপন্যাসটির প্রথম স্তরে যেমন মৃত্যু ও ক্ষুধা—দুইয়েরই উপস্থিতি আছে, তেমনি দ্বিতীয় স্তরে মৃত্যু থাকলেও ক্ষুধা অনুপস্থিত। এই উপন্যাসের রুবি চরিত্রটিও চাঁদ সড়ক এলাকার একটি বাস্তব চরিত্র। লেখক মরমী রায় ‘নজরুল-সান্নিধ্য ধন্যা গোফুরুন্নেসার সান্নিধ্যে’ নামের স্মৃতিকথায় জানাচ্ছেন, কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণনগর শহরের চাঁদ সড়ক এলাকার ‘গ্রেস কটেজ’ বাড়িতে ১৯২৬ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত বসবাস করেন। এ সময় কবির সান্নিধ্যে এসেছিলেন এই এলাকারই এক কিশোরী, আজ তিনি অশীতিপর বৃদ্ধা গোফুরুন্নেসা বিবি। একপর্যায়ে লেখক তাঁর কাছে জানতে চান, ‘নজরুল লিখেছেন চাঁদ সড়ক এলাকার দারিদ্র্যপীড়িত শ্রমজীবী জীবনভিত্তিক উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধা। এই উপন্যাসের নায়িকা রুবি নাকি আপনি?’ গোফুরুন্নেসা হাসলেন। বললেন, ‘লোকে বলাবলি করত আমাকে দেখেই কাজীদা নাকি রুবির চরিত্র লিখেছিলেন।’ লেখক বলে ওঠেন, ‘উপন্যাসের রুবির সঙ্গে আপনার তো মিল নাই?’ গোফুর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘না, তা ঠিক নয়। রুবির সঙ্গে আমার মিল আছে। রুবিরও ছোটবেলায় একবার বিয়ে হয়েছিল, স্বামী এক মাসের মধ্যে মারা যায়। আমারও ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল, আট মাসের মধ্যে আমিও বিধবা হয়েছিলাম। রুবিরও আরেকবার বিয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছিল তার আপত্তি সত্ত্বেও। আমারও তখন বিয়ে দেবার চেষ্টা হচ্ছিল আমার আপত্তি সত্ত্বেও। রুবির মতো আমিও ছিলাম জেদি ও একগুঁয়ে। রুবির মতো আমারও বেপরোয়া ভাব ছিল।’
মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসটি বহুবার পড়েছি। কখনো মনে হয়নি রুবির জীবনের সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে আমার জীবনের একটা যোগসূত্র তৈরি হবে। বিধবা রুবির সঙ্গে আমার জীবন মিলে গেল। একেই বলে ভবিতব্য!
২০২০ সালে বাবা (মুর্তজা বশীর) ও আমার স্বামী সুজাতের এক মাসের মধ্যে অনন্তলোকে অনন্তযাত্রার পর আমি পুরোপুরি ট্রমায় চলে গিয়েছিলাম। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় বাবার বাসায় কাজ করতে যেতাম এই আশা নিয়ে যে বাবার বাসায় সবকিছুর মধ্যে বাবার ছোঁয়া আছে। মনে হতো বাবা আমাকে দেখছেন। একদিন বাবার কাগজপত্র, বইপত্র ও ফাইল ঘাটতে ঘাটতে মৃত্যুক্ষুধার তরুণী কন্যা সদ্য বিধবা রুবির চিত্রকর্মটি পেয়ে যাই। বাবা রুবি চিত্রকর্মটি কাউকে দেননি বা বিক্রি করেননি। রুবি চিত্রকর্মটি আমার হাতেই এসে পড়ল! মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসটি বহুবার পড়েছি। কখনো মনে হয়নি রুবির জীবনের সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে আমার জীবনের একটা যোগসূত্র তৈরি হবে। বিধবা রুবির সঙ্গে আমার জীবন মিলে গেল। একেই বলে ভবিতব্য! বাবা বা আমি কি জানতাম বা আমরা কি বুঝতে পেরেছিলাম, এত তাড়াতাড়ি অদূর ভবিষ্যতে আমার জীবনের সব রং মুছে সাদা রংই আমার জীবনের রং হয়ে যাবে?
যুগে যুগে বিধবাদের জীবনে নেমে আসে সমাজের সব বিধিনিষেধ, জবাবদিহি, অপমান। বিধবা মানে অনাহূত। সব যুগের বিধবাদের সামাজিক বিভেদ, ধর্মীয় বিরোধ, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অসংগতি এবং শাসন-শোষণের সুতীব্র আঁচড়ের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। আমার এক বান্ধবীর কাছ থেকে বছর দুয়েক আগে শুনতে হয়েছিল, ‘বিধবা আর তালাকপ্রাপ্ত মেয়েরা চরিত্রহীন হয়, পরকীয়া করতে পারে। স্বামী নামক সাইনবোর্ডটা তো নাই, তাই যা ইচ্ছা তা–ই করতে পারে। আর যারা সধবা, স্বামী আছে, তাদের ইচ্ছা থাকলেও যা খুশি তা করতে পারে না।’ কথাগুলো শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এই নির্মম সামাজিক ধারণা আমাকে গভীরভাবে আহত করেছিল। অনেক ক্ষেত্রেই বিধবাদের জীবন হয়ে ওঠে নীরব, নিভৃত ও একাকী। তবু আমরা বেঁচে থাকি হাসিমুখে দায়িত্বের আড়ালে অশ্রু লুকিয়ে। কারণ, আমরা জানি আমাদের ভেঙে পড়ার সুযোগ নেই। কেননা প্রতিটি নারীর হৃদয়ে একটা নির্জন জগৎ আছে, যেখানে সে একাই থাকে।
মুনীরা বশীর : মুর্তজা বশীরের জ্যেষ্ঠ কন্যা