যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন চুক্তি করার মতো দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন
· Prothom Alo
ঢাকার শেরাটন হোটেলে গত ২৮ এপ্রিল অ্যামচেম আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক সংলাপে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এআরটি) নিয়ে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তাঁর সেই বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশ ‘নতুন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক’ শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয় ২০ মে। রাষ্ট্রদূতের সেই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া লিখেছেন আনু মুহাম্মদ
Visit milkshakeslot.online for more information.
মার্কিন চুক্তি স্থগিতের দাবিতে সংসদ ভবনের সামনে এনপিএর অবস্থান কর্মসূচিসম্প্রতি ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত তথাকথিত বাণিজ্যচুক্তির পক্ষে যে বক্তব্য দেন, তার অনুবাদ প্রথম আলো ২০ মে প্রকাশ করেছে। এ বক্তব্যে বেশ কিছু ভুল ও অস্বচ্ছ যুক্তি আছে। সংক্ষেপে তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি।
রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য খুবই ভালো ঘটনা। কেননা ‘এটি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ১৯ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক শুল্কহারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সাহায্য করবে। চুক্তি না থাকলে এই হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত।’
এখানে দুটি গুরুতর ভুল আছে। প্রথমত, ১৯ শতাংশ কোনো প্রতিযোগিতামূলকভাবে নির্ধারিত শুল্কহার নয়, এটি বাজার অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়মনীতি ভঙ্গ করে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের জোর করে চাপানো শুল্কহার।
দ্বিতীয়ত, এই চুক্তি না করলে ‘এই হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত’, তা–ও ঠিক নয়। কেননা রাষ্ট্রদূত এই তথ্য গোপন করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, ফেডারেল ও সুপ্রিম আদালত বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের এই উচ্চহারে শুল্ক বসানো অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবেন।
অর্থনীতিতে আমদানি–রপ্তানির কিছু প্রাথমিক শর্ত আছে। কাণ্ডজ্ঞান থেকেও তা বোঝা যায়। রাষ্ট্রদূত এসব অগ্রাহ্য করে বলেছেন, যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুব কম আমদানি করে এবং অন্য দেশ থেকে বেশি আমদানি করে, তাহলে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব হয় না।
এ কথাও ভুল। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ যা রপ্তানি করে, তা তাদের দয়াদাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়। এই রপ্তানি হয়, কারণ সেই দেশে এর চাহিদা আছে এবং সেই দেশেরই বিভিন্ন ব্র্যান্ড এ থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা করে বলেই আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে তারা আমদানি করে।
মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সামনে অশনিসংকেতবাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির ওপর উচ্চ শুল্ক আগে থেকেই আছে। এখন সেখান থেকে তুলা আমদানির বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে এই চুক্তিতে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের আমদানি কম হওয়ার কারণ, তাদের সে রকম পণ্য নেই, যার চাহিদা আমাদের অর্থনীতিতে আছে। থাকলে তাদের জোরজবরদস্তি করতে হতো না, বাজারের নিয়মেই আরও পণ্য সেই দেশ থেকে বাংলাদেশে আসত।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব’ করতে চায়, তাহলে তাকে যুদ্ধমুখী তৎপরতা থেকে সরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। তার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না।
এই চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বাংলাদেশের ওপর উচ্চশুল্ক আরোপ করছে, অন্যদিকে তাদেরই রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনাদের উচিত নয় এত বেশি শুল্ক আরোপ করা!’ উচ্চ শুল্ক আরোপ করা যেন যুক্তরাষ্ট্রের একক এখতিয়ার! আরও বলেছেন, সেখান থেকে আমদানি করা পণ্যে কোনো মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করা যাবে না। কারণ, তারাই মান নির্ধারণে যথেষ্ট।
২.
এই চুক্তিতে রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো যদি প্রতিযোগিতামূলক দামে হয় কিংবা মানসম্পন্ন হয়, তাহলে তো এমনিতেই আমাদের আমদানিকারকেরা আগ্রহ নিয়ে সেগুলো আমদানি করার কথা। তাহলে কেন ট্রাম্প প্রশাসন জোরজবরদস্তিমূলক চুক্তি করছে? এগুলো ঠিক নয় বলে?
রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কিনবে’। এটা মার্কিন বৃহৎ কোম্পানির জন্য ভালো খবর, বাংলাদেশের জন্য নয়। বাংলাদেশের দরকার আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হওয়া। সেই চেষ্টার পথ বন্ধ করে এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতায় ঢুকতে বাংলাদেশকে বাধ্য করবে।
রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, ‘আমেরিকান কোম্পানিগুলো কঠোর কমপ্লায়েন্স বা নিয়ম মেনে চলে’, ‘আমেরিকান কোম্পানিগুলো আইনের শাসনের অধীন কাজ করে’, ‘আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসি’ এবং ‘আমরা সক্ষমতা গঠনে গুরুত্ব দিই।’
বাস্তবে বাংলাদেশে আমরা এসবের প্রমাণ পাইনি। বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি এবং তাদের কাজের মধ্যে কোনো বড় দুর্ঘটনা কখনো ঘটেনি। ১৯৯৭ সালে এ দেশে প্রথম বড় বিস্ফোরণ হয় মাগুরছড়ায় বৃহৎ মার্কিন তেল কোম্পানি অক্সিডেন্টালের হাতে।
তদন্তে জানা গেছে, খরচ বাঁচাতে, অর্থাৎ মুনাফা বাড়াতে গিয়ে কোম্পানি যথাযথ প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল ব্যবহারে কার্পণ্য করেছে। এ কারণে এই বিস্ফোরণ হয়। এতে পরিবেশগত বিপর্যয় ছাড়াও প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের একটি ক্ষেত্র পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতিপূরণ না দিয়ে অক্সিডেন্টাল আরেক বৃহৎ মার্কিন তেল কোম্পানি ইউনোক্যালের কাছে ব্যবসা বিক্রি করে চলে যায়।
ইউনোক্যাল এসে বাংলাদেশের গ্যাস ভারতে রপ্তানির জন্য ব্যাপক তোলপাড় করে। কিন্তু জনপ্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে শেভরনের কাছে ব্যবসা বেচে তারাও চলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের পাওনা সেই ক্ষতিপূরণ দিয়ে যায়নি। বাংলাদেশের কোনো সরকারও তাদের খুশি রাখতে এ নিয়ে কোনো কথা বলেনি।
রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘শেভরন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অর্ধেক দেয়’। কথাটা অসম্পূর্ণ। এই গ্যাস ব্লক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান আবিষ্কার করা সত্ত্বেও তাদের উত্তোলনের অধিকার না দিয়ে মার্কিন কোম্পানিকে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানকে এই গ্যাস উত্তোলন করার সুযোগ দিলে আমরা আরও কম দামে গ্যাস পেতাম, দেশি মুদ্রাতেই তা কেনা যেত। বিদেশি মুদ্রার ওপর চাপ কমত, বাজেট ঘাটতিও কম হতো। বারবার গ্যাস এবং সেই সূত্রে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপও তৈরি হতো না। তা ছাড়া আমাদের পাওনা ক্ষতিপূরণ এখন শেভরনের দায়, যা তারা এখনো পরিশোধ করেনি।
রাষ্ট্রদূত বক্তৃতায় আরও বলেছেন, ‘আমার টিম বাংলাদেশ সরকারকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসার জন্য নতুন ও নমনীয় ব্যবস্থা তৈরিতে কাজ করছে।’
সেটা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার হাস অবসর গ্রহণের পর মার্কিন তেল কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে শেখ হাসিনা, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস—সবার সঙ্গেই দেনদরবার করেছেন। তাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল-গ্যাস চুক্তির দলিল বদলানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তখন থেকেই, যাতে বাংলাদেশের প্রাপ্তির অংশ কমানো হয়েছে, তাদের মুনাফার হার এবং দাম বাড়ানো হয়েছে, রপ্তানির বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমান বাণিজ্যচুক্তিতেও খনিজ সম্পদ রপ্তানির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এগুলো বাংলাদেশে টেকসই জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হবে।
৩.
রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রে ‘জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা’র কথা বলেছেন। নিশ্চয়ই এ ধরনের জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে শুধু রপ্তানি নয়, দেশের বাজারের জন্য উৎপাদনও আমরা চাই না। যেমন চাই না জোরপূর্বক চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া। গত বছরের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব কায়দায় ইচ্ছেমতো উচ্চ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছে, তা হাতে গোনা কয়েকটি বাদে প্রায় সব দেশই অগ্রাহ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই চুক্তির বিষয় স্থগিত করেছে। পরে যুক্তরাষ্ট্র নিজে থেকেই শুল্কহার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে তা পুনর্নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে।
কেন ট্রাম্প প্রশাসন এ রকম পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকটের দিকে তাকালে বুঝতে সুবিধা হবে। বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র, জিডিপির প্রায় দেড় গুণ তার ঋণ। প্রায় বছরই এই ঋণ আরও বাড়ানোর জন্য কংগ্রেসে বিশাল দেনদরবার হয়, অর্থের অভাবে শাটডাউন করা হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কেন বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের এই করুণ দশা? কারণ, এই দেশের বৃহৎ করপোরেট হাউসের স্বার্থে প্রশাসন যেসব নীতি গ্রহণ করে, ভর্তুকি আর কর মওকুফ করে তাতে অর্থনীতির ওপর বহু চাপ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ রকম অধীনতার ‘চুক্তি’ করার মতো আরেকটা দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অনেক দেশও এই পথে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ের পর এই চুক্তির বাধ্যবাধকতার হুমকিও অকার্যকর হয়ে গেছে। তারপরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা কিছু লোক এ সর্বনাশা কাজ করেছেন। কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যতের বহু প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন চুক্তি বাংলাদেশের মানুষ কেন মানবে?
উপরন্তু প্রশাসন যুদ্ধ সমরাস্ত্র খাতে ঋণ করেও বেশুমার অর্থ খরচ করে। সারা দুনিয়া সমরাস্ত্র খাতে যত খরচ করে, তার প্রায় অর্ধেক একা যুক্তরাষ্ট্রই করে। তার ফলাফল দেশে দেশে সামরিক আগ্রাসন, দখল, গণহত্যা। এসবের খরচ তুলতে গিয়ে ঋণ বাড়তে থাকে। এখানেই শেষ নয়, এই বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের কাছে এই খাতে আরও দুই–তৃতীয়াংশ বৃদ্ধির আরজি জানিয়েছেন। এতে এর পরিমাণ হবে দেড় ট্রিলিয়ন ডলার। শিক্ষা–স্বাস্থ্যসহ জনগণের প্রয়োজনীয় খাত বঞ্চিত করে একক বৃহত্তম ব্যয় বরাদ্দ ধ্বংস খাতে। এসবের ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ছেই আর তা মেটানোর চাপ অন্যান্য দুর্বল দেশের ওপর চাপানোর খায়েশ থেকেই এ উন্মাদনা।
সম্পদ ব্যবহারের এ ধরনের কারণেই এত ক্ষমতাশালী দেশ হয়েও যুক্তরাষ্ট্র কখনো গর্ব করে বলতে পারে না, ‘আমাদের দেশে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্যব্যবস্থা আছে’ (ছয় দশক ধরে মার্কিন অবরোধে পিষ্ট হয়েও কিউবা এই কথা বলতে পারে) কিংবা ‘আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থা আছে, সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে’ (অনেক তুলনামূলক দুর্বল দেশই এই দাবি করতে পারে)। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ট্রাম্প বরং গর্ব করেন, তাঁর কাছে ধ্বংস ও গণহত্যার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আছে!
৪.
রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই লাভবান হবে। এটা আংশিক সত্য। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ করপোরেট ও সামরিক কৌশলগত স্বার্থে এই চুক্তি যে বিরাট কাজে দেবে, তা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা কী দেবে?
চুক্তির নামে পাতায় পাতায় ট্রাম্পের আদেশনামা মান্য করলে বাংলাদেশকে বহু পণ্য বাড়তি আমদানি করতে হবে। এসব আমদানি করে বাজারে বিক্রি নিশ্চিত করতে তাতে ভর্তুকি দিতে হবে, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। এগুলোর অনিয়ন্ত্রিত আমদানির কারণে বাংলাদেশের পোলট্রি, ডেইরি, ওষুধশিল্প, ই-কমার্স কৃষি খাতের লাখ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। শুল্কমুক্ত আমদানির কারণে সংকটগ্রস্ত রাজস্ব আয়ে আরও ঘাটতি হবে।
অস্ত্র, বিমানসহ বাধ্যতামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় আমদানি করতে গিয়ে বিশাল ব্যয়ের বোঝা টানতে হবে। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ আরও বাধাগ্রস্ত হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথ কণ্টকাকীর্ণ হবে, দেশের সীমিত গ্যাসসম্পদ রপ্তানির ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশ অন্য দেশের সঙ্গেও স্বাধীনভাবে কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ রকম অধীনতার ‘চুক্তি’ করার মতো আরেকটা দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অনেক দেশও এই পথে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ের পর এই চুক্তির বাধ্যবাধকতার হুমকিও অকার্যকর হয়ে গেছে। তারপরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা কিছু লোক এ সর্বনাশা কাজ করেছেন। কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যতের বহু প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন চুক্তি বাংলাদেশের মানুষ কেন মানবে?
আনু মুহাম্মদ অর্থনীতিবিদ ও সম্পাদক, সর্বজনকথা
মতামত লেখকের নিজস্ব