শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন, গৃহযুদ্ধও উসকে দিয়েছেন—আবারও নির্বাচনের পথে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী

· Prothom Alo

কয়েক দশকের কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা ইথিওপিয়ায় ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসে নতুন শুরুর আশা দেখিয়েছিলেন আবি আহমেদ। আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর একটি ইথিওপিয়ায় নাগরিকেরাও একটি উন্মুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আবি আহমেদের পূর্বসূরি হাইলেমারিয়াম দেসালেন প্রায় ছয় বছর ক্ষমতায় থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সহিংস উপায়ে বিরোধী মত দমনের ঐতিহাসিক ধারা বজায় রেখেছিলেন। এর ফলে দেশটিতে কয়েক বছর ধরে বিক্ষোভ হয় এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভের মুখে দেসালেনকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাত্র ৯০ দিনের মাথায় মাত্র ৪১ বছর বয়সী আবি আহমেদ প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ২০ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকে চমকে দেন। রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং সংবাদমাধ্যমকে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা দেওয়ার মতো সংস্কারও শুরু করেন তিনি। এসব উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তখন অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, তিনি ইথিওপিয়াকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নেবেন।

কিন্তু সেই আশাবাদ বেশি দিন টেকেনি। বর্তমানে ১৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষের দেশ ইথিওপিয়া গভীরভাবে বিভক্ত। জাতিগত সংঘাত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে দেশটি বারবার আলোচনায় এসেছে। একসময় যাঁকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক মনে করা হতো, সমালোচকদের অনেকেই এখন তাঁকেই বিভেদের প্রধান কারণ বলে মনে করেন।

তবে আসন্ন নির্বাচনে এর প্রভাব খুব বেশি পড়বে না মনে করা হচ্ছে। বিরোধী শিবির বিভক্ত এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা চলমান থাকায় ক্ষমতাসীন প্রসপারিটি পার্টির জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ক্ষমতা কুক্ষিগত এবং দেশে দুই বাস্তবতা

১ জুনের নির্বাচন যেন দুটি ভিন্ন ইথিওপিয়ার চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে রাজধানী আদ্দিস আবাবা—নতুন বহুতল ভবন, প্রশস্ত সড়ক, আলোকসজ্জা, পার্ক এবং নতুন শেয়ারবাজার চালুর মতো অর্থনৈতিক সংস্কারের কারণে উন্নয়নের এক উজ্জ্বল চিত্র দেখা যায়।

অন্যদিকে রাজধানীর বাইরে তিগ্রাই, আমহারা ও ওরোমিয়া অঞ্চলে যুদ্ধ, গণহত্যা ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা বিদ্যমান। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইথিওপিয়ার দীর্ঘদিনের জাতিগত ফেডারেল ব্যবস্থার পরিবর্তন আনার চেষ্টার সঙ্গে এসব সংঘাতের সম্পর্ক রয়েছে। সেই ব্যবস্থার অধীন অঞ্চলগুলো নিজেদের আইন প্রণয়ন এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী পরিচালনার সুযোগ পেত।

সুরাফেল গেতাহুন, কেনিয়ায় নির্বাসিত ইথিওপীয় ভূরাজনীতি গবেষকআমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি, তাঁর শাসনামলে ইথিওপীয়রা আজকে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত। বিদ্যমান জাতিগত বৈরিতা ইথিওপীয় সমাজের সামাজিক সংহতিকে ভেঙে দিয়েছে। ফলে সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে অনাস্থা দেখা দিয়েছে।

প্রায় তিন দশক ধরে ইথিওপিয়া শাসন করেছে ইপিআরডিএফ নামে একটি জোট, দেশের প্রধান চারটি এলাকার প্রতিনিধিত্বকারী জাতিগত চার দলের জোট ছিল সেটি। তিগ্রাই, আমহারা, ওরোমিয়া ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী এই জোটই আবি আহমেদকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। দেসালেনকে পদত্যাগে বাধ্য করা বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিকে শান্ত করতে সে সময় আবিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু আবি আহমেদ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মাত্র এক মাস পর ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইপিআরডিএফ বিলুপ্ত করে প্রসপারিটি পার্টি গঠন করেন। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক বাহিনীগুলোকে বিলুপ্ত করে জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত হওয়ার নির্দেশ দেন। প্রসপারিটি পার্টি হলো একক রাজনৈতিক দল, তারা অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিভিত্তিক দলগুলোকে সঙ্গে নেয়।

এই পদক্ষেপে তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) তাদের দীর্ঘদিনের প্রভাব হারায় এবং সরাসরি বিরোধিতায় নামে। আবি আহমেদের নিজের এলাকা ওরোমিয়াসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকেও প্রতিরোধ দেখা দেয়।

পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে সরকার আবারও কঠোর নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটে। বিরোধী নেতা ও সাংবাদিকদের আটক করা হয় এবং নির্বাচন স্থগিত করা হয়। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে তিগ্রাই নিজস্ব নির্বাচন আয়োজন করলে বিরোধ আরও তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের নভেম্বরে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এ যুদ্ধে আনুমানিক ছয় লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়। ২০২২ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি হলেও পরে সেই সমঝোতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দেশটিতে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে শুধু তিগ্রাই নয়, আমহারা ও ওরোমিয়াতেও সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। স্বায়ত্তশাসন, সীমান্ত ও জাতিগত বৈষম্য নিয়ে বিরোধের কারণে লাখো মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।

বিভক্ত একটি জাতি

কেনিয়ায় নির্বাসিত ইথিওপীয় ভূরাজনীতি গবেষক সুরাফেল গেতাহুনের মতে, জাতিগত মেরুকরণ, দুর্বল প্রশাসন, বৈষম্য এবং নির্বিচার গ্রেপ্তারের কারণে আবি আহমেদের সরকারের বৈধতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, আবির শাসনামলে ইথিওপীয়রা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভক্ত।

এই গবেষক বলেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি, তাঁর শাসনামলে ইথিওপীয়রা আজকে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত। বিদ্যমান জাতিগত বৈরিতা ইথিওপীয় সমাজের সামাজিক সংহতিকে ভেঙে দিয়েছে। ফলে সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে অনাস্থা দেখা দিয়েছে।’

সুরাফেল গেতাহুন জানান, বিদেশি গণমাধ্যমে কথা বলার কারণে ২০২৪ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। তাঁর মতে, নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ায় আবি আহমেদ এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত বিভাজনমূলক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।

আবি আহমেদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এটাই নতুন নয়। ২০২১ সালে ওয়াশিংটনে ইথিওপিয়ার দূতাবাসের উপপ্রধান বেরহানে কিদানেমারিয়াম তিগ্রাইয়ে সংঘাতের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। এক খোলাচিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় ঐক্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও আবি আহমেদ শেষ পর্যন্ত দেশকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

চিঠিতে বেরহানে কিদানেমারিয়াম লেখেন, ‘সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়গুলোর একটি হলো, একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি ঐক্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তিনি বেপরোয়াভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ বাড়িয়ে দিয়েছেন।’

তবে আবির কার্যালয় এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করে।

নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্য হবে

এই রাজনৈতিক বিভাজন যত গভীর হচ্ছে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ততই প্রশ্ন উঠছে। এ নির্বাচনে গঠিত সংসদই পরবর্তী সরকার নির্ধারণ করবে এবং বিজয়ী দল প্রধানমন্ত্রীর নাম ঠিক করবে।

আবি আহমেদ একে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল নির্বাচন বলে দাবি করলেও বাস্তবে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলমান সংঘাতের কারণে তিগ্রাই ও আমহারার কিছু অংশে ভোট হচ্ছে না। বিরোধী দলগুলোও রাজনৈতিক হয়রানি ও প্রশাসনিক বাধার অভিযোগ করেছে।

দেশের বৃহত্তম জাতীয় বিরোধী দল ইজেমার নেতা ইয়োব মেসাফিন্ট বলেন, তাঁদের দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা অগণতান্ত্রিক চর্চা, বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিরোধীদের শক্ত অবস্থান রয়েছে, বজায় থাকার লক্ষণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অবশ্য তাঁর ধারণা, ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার কিছুটা বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে।

এবার ক্ষমতাসীন দল দুই ডজনের বেশি আসনে প্রার্থী দেয়নি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংসদে বিরোধীদের উপস্থিতি বাড়িয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্বাসিত গবেষক সুরাফেল গেতাহুনের মতে, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের সম্ভাবনা খুবই কম। তাঁর ভাষায়, ‘অনেক পর্যবেক্ষকের মতো আমিও মনে করি, আসন্ন নির্বাচন আসলে ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক পুনঃনিশ্চিতকরণ ছাড়া আর কিছু নয়।’

Read full story at source