বেনজীর যেভাবে দেশ ছেড়েছিলেন
· Prothom Alo
সম্পদ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবার দেশ ছাড়েন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
তখন অভিযোগ উঠেছিল, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে ‘সিগন্যাল’ পেয়েই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। বিমানবন্দরে তাঁকে আটকানো হয়নি।
অবশেষে ইন্টারপোলের সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ১২ জুন বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য।’
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক। তার আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।
বেনজীর আহমেদের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।
গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং এর সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ তালিকায় ছিলেন বেনজীর আহমেদ। অবশ্য র্যাবের দায়িত্বে পালন শেষে তখন তিনি ছিলেন আইজিপি।
২০২৪ সালের দিকে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একের পর অভিযোগ আসতে থাকে সংবাদমাধ্যমে।
২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ অনুসন্ধানে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সংস্থাটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিপুল সম্পদ। কিন্তু অনুসন্ধান চলার মধ্যেই সপরিবার দেশ ছাড়েন বেনজীর।
বেনজীররা কীভাবে সবার চোখ এড়িয়ে দেশ ছাড়েনতখন ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা) ফুটেজের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ৪ মে রাতে রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ। তখন তাঁর পেছনে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকেও দেখা যায়।
তখন প্রশ্ন উঠেছিল, দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে বেনজীর বিদেশে চলে গেলেন? নাকি তাঁদের বিদেশ চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ অবসরের পরও পুলিশি নিরাপত্তা পেয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই সময়ের বিজ্ঞপ্তি বলছে, তাঁকে গাড়িসহ সাদাপোশাকের ছয়জন পুলিশ সদস্যের একটি দল নিরাপত্তা দেবে। তিনি দুজন সশস্ত্র দেহরক্ষী পাবেন। তাঁর বাসায় তিনজন পাহারাদার থাকবে।
অবসর নেওয়ার পর দুদকের অনুসন্ধান শুরুর আগে বেনজীর অনেকটা আড়ালে ছিলেন। দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরুর পর ২০২৪ সালের ২৭ মে বেনজীর পরিবারের বাসভবনে গিয়েও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। বাসার একজন নিরাপত্তাকর্মী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তিনি মাসখানেক বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেখেননি। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বেনজীর সপরিবার ৪ মে দেশ ছাড়েন।
সাবেক আইজিপি বেনজীরের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিশ’ জারিদেশ ছাড়ার আগে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন বলে জানা গেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্রে।
বেনজীরের দেশে থাকা না–থাকা নিয়ে তখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি বলেন, ‘তাঁকে (বেনজীর) আমরা এখনো নিষেধাজ্ঞা দিইনি। সে যদি নিষেধাজ্ঞার আগে চলে গিয়ে থাকে...। আমি এখনো কিন্তু সঠিক জানি না, সে আছে নাকি চলে গেছে।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তখন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বেনজীর বিদেশে থাকলেও তাঁর বিচার চলবে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে দেশে ফিরতেই হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর পর থেকে ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগ নেতারা বিদেশে। তাঁদের অনেকের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। অনেকের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। অনেকে দুদকের দুর্নীতির মামলার আসামি।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তারবেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা রয়েছে। আবার দুর্নীতির মামলায়ও আসামি তিনি। দেশে ফিরলে তাঁকে এসব মামলায় বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ সংসদে জানান, বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে। এনসিবি (পুলিশ সদর দপ্তরের একটি শাখা, যারা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে) আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে। অতি দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার পুলিশের ঐতিহাসিক সাফল্য: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী