একসঙ্গে জন্ম নেওয়া পাঁচ শিশু এনআইসিইউতে, বাঁচানোর চেষ্টায় মা–বাবা

· Prothom Alo

মোস্তাকিম হোসেন (২৪) ও সামরিনা আক্তার (২০)। বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায়। দুই বছর বিয়ে হয়েছে তাঁদের। গর্ভধারণের ৩ মাসের মাথায় সামরিনার আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়। তাঁর গর্ভে ছয় সন্তান থাকার কথা জানা যায়।

চিকিৎসকেরা বলেন, এমন গর্ভধারণ মা ও নবজাতকের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই এ দম্পতিকে গর্ভপাতের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্য আর আত্মীয়স্বজনও সেটাই চাইছিলেন। কিন্তু এই মা–বাবা চাইলেন সন্তানেরা পৃথিবীর আলো দেখুক।

Visit syntagm.co.za for more information.

তত দিনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সামরিনার গর্ভে পাঁচটি সন্তান টিকে আছে। কয়েক মাসের প্রচণ্ড শারীরিক ধকল, দুশ্চিন্তা ও আর্থিক টানাপোড়েন পেরিয়ে গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন সামরিনা। তিনটি ছেলে, দুটি মেয়ে।

নির্ধারিত সময়ে বেশ আগেই সামরিনা সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তাই নবজাতকেরা অপরিণত। ওজন কম, একেকজনের এক কেজির মতো। তিনটি শিশু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ভর্তি আছে। বাকি দুটি শিশু রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি আছে।

সামরিনা আক্তার, একসঙ্গে পাঁচ সন্তান জন্ম দেওয়া মা।তিনি ও মোস্তাকিম দুজনই সাধারণ পরিবারের সন্তান। আর্থিক অবস্থাও সাধারণ। মোস্তাকিমের স্থায়ী চাকরি নেই। ঋণ করে খরচ চালাচ্ছেন।

এনআইসিইউতে রাখতে হবে মাসখানেক

গতকাল রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে কথা হলো সামরিনার সঙ্গে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সদ্য মা হওয়া সামরিনা জানালেন, সন্তানদের জন্ম দিতে পেরে তিনি খুবই খুশি। তবে উৎকণ্ঠা ভর করেছে মনের কোণে। সন্তানেরা অপরিণত, এনআইসিইউতে ভর্তি—এটা নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা হয়।

সামরিনা বললেন, নির্ধারিত সময়ের আগে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া পাঁচ সন্তানকে মাসখানেক এনআইসিইউতে রাখতে হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন। দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসার জন্য অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, সেই উৎকণ্ঠা তাঁর মনে।

কথায় কথায় সামরিনা বললেন, তিনি নোয়াখালীর জয়াগ মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু গর্ভধারণের কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। স্বামী মোস্তাকিম প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলেন।

সামরিনার সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন মোস্তাকিম সেই বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে এনআইসিইউতে থাকা দুই শিশুসন্তানের কাছে গেছেন তিনি। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সামরিনার সঙ্গে তাঁর মা আছেন।

এমন ঘটনা কমই দেখা যায়

কথা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। নিজ কার্যালয়ে বসে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মেয়েটির (সামরিনা) শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। গর্ভধারণের মাত্র ৩০ সপ্তাহে অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্ম দিয়েছেন তিনি।

পরিচালক আসাদুজ্জামান বলেন, নবজাতকের ওজন আড়াই কেজির নিচে হলে সাধারণত অপরিণত বলা হয়। এই পাঁচ শিশুর ওজন এক কেজির নিচে। সুস্থতার জন্য এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, একসঙ্গে তিনটি সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। তবে এতগুলো শিশুর জন্ম খুব একটা দেখা যায় না। গত আড়াই বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমন দুটি ঘটনা ঘটেছে বলেও জানান পরিচালক আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, এর আগে এক নারী এখানে একসঙ্গে ছয় সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এই হাসপাতালে এনআইসিইউতে মাত্র ৩৮টি সিট আছে। পরিবারটিকে তিনটির বেশি সিট দেওয়া সম্ভব হয়নি। অপেক্ষমাণ তালিকায় আরও অনেক শিশু রয়েছে।

একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্ম দেওয়ার খবর পেয়ে সামরিনাকে সহায়তা করছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের শিশুবিষয়ক হেল্পলাইন ১০৯৮–এর শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী শাহানাজ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর শিশুদের এনআইসিইউতে ভর্তিসহ চিকিৎসায় যতটুকু সম্ভব সহায়তা করছে।

মোস্তাকিম হোসেন

কষ্টের যাত্রা, তা–ও আনন্দ

সামরিনা বললেন, দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনিই বড়। বছর দুয়েক হলো পারিবারিকভাবে মোস্তাকিমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে। আরও বলেন, ‘আমাদের প্রথম বাচ্চা। আমার মনে হচ্ছিল, আল্লাহ আমার উসিলায় পাঁচটা প্রাণ বাঁচিয়ে রাখুক।’

কিন্তু এর পর শুরু হয় সামরিনার কষ্টের যাত্রা। বললেন, গর্ভে পাঁচ সন্তান থাকায় পেট অস্বাভাবিক বড় হয়ে গিয়েছিল। পা ফুলে গিয়েছিল। খেতে পারতেন না। নড়াচড়াও করতে কষ্ট হতো। চিকিৎসকের পরামর্শে বেশির ভাগ সময় শুয়ে–বসে থাকতে হতো। হাঁটার সময় দুজন দুই পাশ থেকে ধরে থাকতেন। পাঁচ মাসে ওজন ৫২ কেজি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮৭ কেজিতে।

গর্ভধারণের তখন ৬ মাস চলছে, নোয়াখালীর হাসপাতাল থেকে মোস্তাকিম আর সামরিনাকে জানানো হয়, সেখানে সন্তান জন্মের ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সামরিনাকে যেন ঢাকায় নিয়ে আরও বড় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়। তখন ঢাকায় চলে আসেন তাঁরা। এক কক্ষের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

সামরিনা বলেন, সুস্থভাবে সন্তানদের জন্ম দেওয়ার জন্য তাঁকে ব্যয়বহুল ইনজেকশন নিতে হয়েছে। গর্ভের সন্তানেরা সুস্থ আছে কি না, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে গঠন হচ্ছে কি না, এসব জানার জন্য প্রতি মাসে প্রত্যেক শিশুর জন্য আলাদা আলাদা ব্যয়বহুল অ্যানোমালি স্ক্যান পরীক্ষা করাতে হয়েছে।

চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, সামরিনার গর্ভাবস্থা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ৩২ সপ্তাহে অস্ত্রোপচারে সন্তানের জন্ম দিতে হবে। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তার আগেই, ৩০ সপ্তাহে অস্ত্রোপচার করা হয়।

সামরিনা জানান, তাঁর প্রস্রাবে সংক্রমণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ১২ দিন ভর্তি থাকার সময় হঠাৎ গর্ভের সন্তানের হৃৎস্পন্দন কমে যায়। তখনই চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক।একসঙ্গে তিনটি সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। তবে এতগুলো শিশুর জন্ম খুব একটা দেখা যায় না। গত আড়াই বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমন দুটি ঘটনা ঘটেছে।

উৎকণ্ঠা খরচ নিয়ে

চিকিৎসার এত খরচ কীভাবে সামলাচ্ছেন, জবাবে সামরিনা বলেন, তিনি ও মোস্তাকিম দুজনই সাধারণ পরিবারের সন্তান। আর্থিক অবস্থাও সাধারণ। মোস্তাকিমের স্থায়ী চাকরি নেই। ঋণ করে খরচ চালাচ্ছেন।

মোস্তাকিম স্ত্রীর প্রতি বেশ যত্নশীল বলে জানান সামরিনা। তিনি বলেন, ‘খরচের কথা জিজ্ঞেস করলে ও বলে, “তুমি এই শরীরে আর দুশ্চিন্তা কোরো না।”’

ঘড়িতে ততক্ষণে বেলা তিনটা। বেসরকারি হাসপাতালে দুই সন্তানকে রেখেই স্ত্রীর পাশে এলেন মোস্তাকিম। বললেন, ঢাকা মেডিকেলে শুধু ওষুধ আর পরীক্ষার জন্য টাকা লাগে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে দিনে প্রায় ৫০ হাজার টাকার বিল উঠছে।

সদ্য বাবা হওয়া মোস্তাকিম আরও বলেন, স্ত্রীর গর্ভধারণের সময় থেকে সন্তান জন্ম নেওয়া পর্যন্ত ৭ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে। ঢাকায় তাঁর ক্রীড়াসামগ্রীর একটি দোকান ছিল। সেটা বিক্রি করে দিয়েছেন। স্বজন আর বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে সহায়তা নিয়েছেন।

তবে এত উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তার মধ্যেও মোস্তাকিম বললেন, সন্তানদের জন্য তিনি খুব আনন্দিত। স্ত্রী–সন্তানেরা যেন সুস্থ হয়ে ওঠে, সেটাই এখন তাঁর চাওয়া।

Read full story at source