গাজর দিয়ে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে বাজিয়েছিলেন সঞ্জয়, মুজার সঙ্গে কথোপকথনে আরও যা বললেন
· Prothom Alo
সম্প্রতি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কানাডার টরন্টোর বিএমও স্টেডিয়ামে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গায়ক, সংগীত পরিচালক ও ডিজে সঞ্জয় দেব শুধু তাঁর পরিবেশনা আর পোশাকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশকে। ফলে এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ পেয়েছে নিজেদের একজন তারকা। বছর দুয়েক আগে আরেক মার্কিন-বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী, প্রযোজক মুজার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অংশ নেন সঞ্জয়। প্রাণবন্ত সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ রইল এখানে।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে পরিবেশনার ফাঁকে সঞ্জয় দেব তাঁর জ্যাকেটের হাতার দিকে ইঙ্গিত করে এই বিশেষ নকশাগুলো তুলে ধরেন৩৫ বছর বয়সী সঞ্জয় দেব বাংলাদেশি-মার্কিন ইলেকট্রনিক মিউজিক প্রযোজক, ডিজে, গীতিকার ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। তিনি মূলত ইডিএম (ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক), ড্যান্স-পপ ও দক্ষিণ এশীয় সুরের মিশ্রণে কাজ করেন।
Visit casino-promo.biz for more information.
সঞ্জয়ের জন্ম রাজধানী ঢাকায়, ১৯৯১ সালের ১৮ ডিসেম্বর। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। সঞ্জয় ছেলেবেলার একটি বড় অংশ কাটিয়েছেন চট্টগ্রামে। ২০০৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সঞ্জয় উড়াল দেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেই অভিজ্ঞতা খুব সহজ ছিল না সঞ্জয়ের জন্য।
ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে তৈরি একটি ভিডিওতে সঞ্জয় বলেন, ‘আমি আমার মা–বাবাকে নিয়ে গর্বিত। আমি যেখান থেকে এসেছি, আমার জন্মভূমি নিয়ে গর্বিত। তবে এখানে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ ছিল না। আমি দেখতে অন্য রকম—নতুন জায়গায়, নতুন শিশুকে স্থানীয় শিশুরা সহজভাবে গ্রহণ করে না। সেই একান্ত সংগ্রামগুলো আমারও ছিল। তবে আমি সব সময়ই এ রকম একটি বড় মুহূর্তের জন্য (ফিফার মঞ্চে পারফর্ম করা) নিজেকে তৈরি করছিলাম।’
সঞ্জয় এ-ও জানান, কঠিন দিনগুলোয়, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সংগীতই ছিল তাঁর একমাত্র আশ্রয়। তাঁর মা মিতা দেব ছিলেন প্রশিক্ষিত সংগীতশিল্পী। তিনিই সঞ্জয়কে গান শেখায় উৎসাহিত করেছেন। ছোটবেলায় সঞ্জয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও তবলা শিখেছেন।
সঞ্জয় প্রথমে বলিউড গানের রিমিক্স ও ম্যাশআপ তৈরি করে পরিচিতি পান। পরে নিজস্ব ইডিএম ও পপ গান প্রকাশ করেন। ভারতের সুনিধি চৌহান, জনিতা গান্ধী, সিড শ্রীরামসহ দক্ষিণ কোরিয়ান গট সেভেন ব্যান্ডের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গেও নিয়মিত কাজ করছেন। বাংলা গানকে আন্তর্জাতিক শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথাও বলেছেন।
বাংলাদেশি ডিজাইনারদের চোখে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চের সেরা পোশাকমার্কিন-বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী, প্রযোজক মুজার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অংশ নেন বাংলাদেশি-মার্কিন ইলেকট্রনিক মিউজিক প্রযোজক, ডিজে, গীতিকার ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জয় দেব (বাঁয়ে)বছর দুয়েক আগে আরেক মার্কিন-বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী, প্রযোজক মুজার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় বলেন, বাংলা গান একদিন স্প্যানিশ বা আফ্রোবিটসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে।
তখন মুজা বলেন, তোমার মতো শিল্পীরাই তা করবে।
সঞ্জয় মনে করেন, বাংলাদেশি শিকড় ও যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠার এই মিশ্রণই তাঁর সংগীতের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে।
মুজার সঙ্গে সঞ্জয়ের ওই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো এখানে।
মুজা: নতুন যারা মিউজিককে পেশা হিসেবে নিতে চায়, তাদের তুমি কী বলতে চাও?
সঞ্চয়: আমি বলার কেউ না। অনেকে অনেকভাবে গান করে অনেক টাকা আয় করবে; কিন্তু বাস্তবতা সবার জন্য একরকম নয়। কেউ প্রথম গানেই টিকটক, ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হয়ে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে। আবার কেউ হয়তো কখনো বিশাল হিট পায় না; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলে।
সঞ্জয় মনে করেন, বাংলাদেশি শিকড় ও যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠার এই মিশ্রণই তাঁর সংগীতের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেমুজা: তুমি যখন মিউজিককে পেশা হিসেবে নাও, তোমার মা–বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? কেননা, আমার মা–বাবা সহজভাবে নেননি। আমি খুবই রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে। কলেজ ড্রপআউট, কয়েকবার চাকরি করার চেষ্টা করেছি। পারিনি। বুঝলাম যে মিউজিক ছাড়া আমি আসলে কিছুই পারি না।
সঞ্চয়: আমি আসলে কখনোই বলি না যে আমি পেশাদার মিউজিশিয়ান। আমি আমার পরিবারের মধ্যে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে আসি। আমার মা–বাবা বা পরিবার এটা নিয়েই খুশি ছিল। আমি মিউজিক করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যখন এখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) এসে খুবই সংগ্রাম করছিলাম, তখন সবকিছু থেকে পালাতে মিউজিককে আঁকড়ে ধরি। আমি এক দিনও মিউজিক তৈরি না করে থাকতে পারি না, তাই কাজটা করছি। সংগীত সব সময় আমার জীবনের অংশ ছিল, এটাকে পেশা হিসেবে ভাবিনি কখনো।
মুজা: এখন তো বলা যেতে পারে তুমি সফল মিউজিশিয়ান, এই হিসাবে তোমার প্রাপ্তি বা সেরা মুহূর্ত কী? আমার ক্ষেত্রে যেমন মা–বাবা টাইমস স্কয়ারে আমার পোস্টার দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন…।
সঞ্চয়: ১৫ বছর পর করোনা মহামারিকালের শেষে যখন শ্রীমঙ্গলে আমার গ্রামে যাই, গ্রামের সব মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সবাই বলছিল যে আমাকে নিয়ে তাঁরা কত গর্বিত। সেই ভালোবাসা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল যে হয়তো কিছু একটা করেছি!
পুরান ঢাকার তেহারি পছন্দ হলেও গায়ক মুজা কেন খেতে পারছেন নামুজা চেয়েছিলেন ফুটবলার হতেমুজা: তুমি কীভাবে মিউজিক তৈরি করো?
সঞ্চয়: আমার একক কোনো নিয়ম নেই। যখন অনুপ্রাণিত থাকি, তখন সব একসঙ্গে চলতে থাকে। তবে সাধারণত আমি আগে কর্ড প্রগ্রেশন তৈরি করি। তারপর তার ওপর সুর বসাই। পরে কথা লিখি। সবশেষে আসে প্রোডাকশন।
মুজা: কারও সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে তোমার কি কোনো নীতি আছে?
সঞ্চয়: আগে তো আমি সরাসরি মেসেজ পাঠিয়ে জানাতাম যে আমি তোমার সঙ্গে কাজ করতে চাই। আমার শিল্পী বাছাই করার অপশন ছিল না। তবে এখন শিখেছি, কারও সঙ্গে গান করার আগে তার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো জরুরি। শুধু ডিএম করে স্টুডিওতে ঢুকে পড়লে অনেক সময় কাজটা ‘জোর করে করা’ মনে হয়। আর কাজেও সেটার ছাপ থাকে; কিন্তু আগে বন্ধুত্ব হলে কাজ অনেক সহজ হয়। তুমি তাকে বোঝো, সে–ও তোমাকে বোঝে। তখন কাজটা সহজ হয়ে যায়; আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজটা ভালো হয়।
মুজা: তুমি সবচেয়ে অদ্ভুত কোন বস্তু দিয়ে মিউজিক বানিয়েছ?
সঞ্জয়: আমি গাজরে সমান দূরত্বে কয়েকটা ছিদ্র করে সেটিকে পিকোলোর (পশ্চিমা কনসার্ট ফ্লুটের একটি ছোট সংস্করণ) মতো বাজিয়েছিলাম। সুন্দর আওয়াজ হয়।
মুজা: তোমার প্রিয় বাংলা ‘স্ল্যাং’ কী?
সঞ্জয়: ‘প্যারা নাই’। বাংলাদেশে গিয়ে এই শব্দ শিখেছি। এর মানে হলো ‘কোনো সমস্যা নেই’। এটা খুবই ছোট, মজার আর খুবই ব্যবহারিক।
মুজা: ভারতীয় নাকি বাংলাদেশি খাবার?
সঞ্জয়: আমি দুটিই সমান ভালোবাসি। উত্তর ভারতের খাবার যেমন ভালো লাগে, তেমনি বাঙালি খাবারও। বাংলাদেশের বিরিয়ানি আমার খুব পছন্দ।
মুজা: আর ঢাকার ‘হাজীর বিরিয়ানি’ তো একেবারে আলাদা। শর্ষের তেল ব্যবহার করার কারণে এর স্বাদই অন্য রকম। আচ্ছা বলো, যদি সংগীতশিল্পী না হতে তাহলে কী হতে?
সঞ্জয়: পাইলট হতাম। আমি সারা দিন প্লেন নিয়ে ভিডিও দেখি।
সঞ্জয় ও মুজা বাংলা গান ও সংস্কৃতি তুলে ধরছেন বিশ্বের সামনেমুজা: আমার ক্ষেত্রে ফুটবল। আমি ভালো খেলতাম; কিন্তু অল্প বয়সে বিদেশে গিয়ে ফস্টার পরিবারের সঙ্গে থাকতে হতো। মা–বাবা রাজি ছিল না। তাই ফুটবল ছেড়ে দিতে হয়েছিল। অবশ্য এখন ফিফা ভিডিও গেমে আমি বেশ ভালো! এখন বলো, তুমি তো বাংলাদেশে আর এখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) সবখানেই কাজ করেছ। এই দুই জায়গায় মিউজিকের টেস্ট কেমন?
সঞ্জয়: যুক্তরাষ্ট্রের শ্রোতারা অনেক ঘরানা শুনেছে। তাই এখানে অনেক সাব-জনরা জনপ্রিয়। বাংলাদেশে এখনো মূলত পপ সংগীত সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর আগে রক সংগীতের আধিপত্য ছিল। তবে বাংলাদেশে বলিউডের গান, ভারত ও পাকিস্তানি কোক স্টুডিওর গানগুলো জনপ্রিয়।
মুজা: বাংলাদেশে মানুষ এখনো লাইভ ইনস্ট্রুমেন্ট খুব ভালোবাসে। তাই আমি আধুনিক সাউন্ডের সঙ্গে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র মেশানোর চেষ্টা করি। যেমন ‘ঝুমকা’ গানে দোতারা ব্যবহার করেছি। কোরিয়ানরা তো ‘ঝুমকা’ গানের লিরিক পর্যন্ত মুখস্থ করে গেয়েছে। তোমার কি মনে হয় না বাংলা গান আন্তর্জাতিক হতে পারে?
সঞ্জয়: অবশ্যই। বাংলা বিশ্বের অষ্টম সর্বাধিক কথিত ভাষা। শুনতেও খুব মিষ্টি। যেভাবে আফ্রোবিট বা স্প্যানিশ গান বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে, বাংলা গানও হতে পারে।
সূত্র: পপশিফট
বিশ্বকাপের উদ্বোধনে সঞ্জয়ের হাতে জ্বলজ্বল করল বাংলাদেশের লাল–সবুজ, কার নকশা করা পোশাক পরলেন