মেসি, ম্যারাডোনা আর বাংলাদেশ: আর্জেন্টিনা থেকে ঢাকায় ভালোবাসার খোঁজে সান্তিয়াগো
· Prothom Alo

খেলা কেবল নিছক আনন্দ দেয় না কখনও কখনও হয়ে ওঠে ভাষা, সংস্কৃতি আর আবেগের সেতুবন্ধন। বিশ্বকাপ ফুটবল সেই বিরল ঘটনাগুলোর একটি, যা হাজার হাজার মাইল দূরের দুই দেশকেও অবিশ্বাস্যভাবে কাছাকাছি এনে দিতে পারে। এরই এক জীবন্ত উদাহরণ আর্জেন্টিনার পর্যটক সান্তিয়াগো আউফ্রাঙ্ক।
Visit lej.life for more information.
২০২২ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-উন্মাদনা শুধু এই দেশের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সেই আবেগ পৌঁছে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার ঘরে ঘরে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গিয়েছিল বাংলাদেশের রাস্তাজুড়ে আকাশি-সাদা পতাকার ঢেউ, মেসির জার্সি গায়ে হাজারো মানুষ, জয়ের পর উন্মাতাল উদযাপন। সেই দৃশ্যই নাড়িয়ে দিয়েছিল মেসির জন্মস্থান রোজারিওর অধিবাসী সান্তিয়াগোকে।
ঢাকায় ঘুরছেন সান্তিযাগোআড্ডার শুরুতেই বললেন, “আমি খুব স্পষ্টভাবে সেই প্রথম ভিডিওটার কথা মনে করতে পারি, একটা ফাঁকা রাস্তা। হঠাৎ করেই একদিক থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসছে, সবার হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা। ভিডিওর ক্যাপশনে দেখলাম এটা বাংলাদেশ। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, কীভাবে পৃথিবীর এত দূরের একটি দেশ আমাদের জন্য এতটা পাগল হতে পারে?”
সেই বিস্ময়ই থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন পরবর্তী বিশ্বকাপে বাংলাদেশে আসার, এই ভালোবাসাকে চাক্ষুস করা।
ঢাকার রাস্তা যেন ছোট্ট আর্জেন্টিনা
ঢাকায় রিকশারাইডবাংলাদেশে এসে সান্তিয়াগোর প্রথম বড় চমক পান ঢাকার রাস্তায় আর্জেন্টিনার জার্সির এতো উপস্থিতি দেখে। “সত্যি বলতে, তোমরা অনেক জায়গায় আমাদের থেকেও বেশি,” হাসতে হাসতে বললেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, ম্যাচের দিন আর্জেন্টিনায় পুরো দেশ থমকে যায়। অফিস-আদালত, কাজকর্ম সবকিছু থেমে যায় জাতীয় দলের খেলা দেখতে। তোমাদের মতো খোলা জায়গায় বড় স্ক্রিনে খেলা দেখা হয় না কখনোই; আমরা খেলা দেখি বারে এবং বাসায় বসে। এবার আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে যাবো আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে। আমি খুবই একসাইটেড দেখার জন্য। সাধারণ দিনে রাস্তায় এত পতাকা, এত জার্সি, এত সজ্জা আর্জেন্টিনাতেও খুব একটা দেখা যায় না।
প্রথম আলো অফিসে“বাংলাদেশে এসে আমি শুধু পতাকা দেখিনি। লুঙ্গি, তোয়ালে, ঘড়ি, চাদর সবকিছুতে দেখছি আর্জেন্টিনা! এটা অবিশ্বাস্য।”
ঢাকার যানজট কি তাকে বিরক্ত করেছে? এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর ছিল আরও চমকপ্রদ: “ঢাকা খুব ভিড় আর ট্রাফিকে ভরা এটা সত্যি। কিন্তু মানুষ এত হাসিখুশি আর আন্তরিক যে আমি ট্রাফিকের কথা ভুলেই যাই। আমি যখন বলি আমি আর্জেন্টিনা থেকে এসেছি, সবার চোখে যে উচ্ছ্বাস দেখি, সেটাই সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা।”
ফুটবল আর্জেন্টিনার শিরায়-শিরায়
ফুটবল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশআর্জেন্টিনায় ফুটবল ঠিক কী? খেলা, নাকি পরিচয়? সান্তিয়াগোর উত্তর দুটোই; এবং তার চেয়েও বেশি। “ফুটবল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ছোটবেলায় পাঁচ মিনিট সময় পেলেই আমরা বল নিয়ে মাঠে নেমে যেতাম। স্কুলের বিরতিতে, পাড়ায়, ক্লাবে সব জায়গায় ফুটবল।” শুধু খেলা নয়, স্টেডিয়ামে যাওয়াও তাদের সংস্কৃতির অংশ। ম্যাচ শুরুর অনেক আগে পৌঁছে যাওয়া, স্টেডিয়ামের বাইরে খাবার খাওয়া, একসঙ্গে গান গাওয়া, স্লোগান দেওয়া সব মিলিয়ে ফুটবল একটি সামাজিক অভিজ্ঞতা। “অনেকেই শুধু খেলা দেখতে যায় না, পুরো অভিজ্ঞতাটা উপভোগ করতে যায়,” বললেন সান্তিয়াগো।
মেসি, ম্যারাডোনা এবং পরিচয়ের গল্প
দুই কিংবদন্তি, অভিন্ন আবেগআর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে দিয়াগো ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসি শুধু কিংবদন্তি নন, তাঁরা দেশটির মানুষের আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সান্তিয়াগোর মতে, বিশেষ করে ম্যারাডোনা বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার পরিচয় বদলে দিয়েছেন। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-প্রেমের পেছনেও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার জাদুকরী নৈপুণ্য এবং বিশ্বকাপ জয় বড় একটি কারণ বলে মনে করেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে আমি তাঁকে জানালাম, বুয়েনোস আইরেসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে একটি রাস্তা রয়েছে। বিষয়টি শুনে সান্তিয়াগো স্পষ্টই বিস্মিত হলেন। আরও জানালাম, আর্জেন্টিনার খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো সরাসরি সমর্থন জানিয়েছিলেন। আলাপের এক পর্যায়ে বললাম, এদেশের বহু মানুষ এখনো চে গুয়েভারাকে বিপ্লবের এক প্রতীক হিসেবে ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে। এটি শুনে সান্তিয়াগো মুগ্ধ হয়ে জানান, বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার এই সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়ে তিনি আরও জানতে চান এবং এ বিষয়ে আরও পড়াশোনা করবেন। ঢাকায় কাটানো এই কয়েকদিনে বাংলাদেশি সমর্থকদের আবেগও তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তাঁর ভাষায়, এখানে সমর্থন শুধু একটি দলের প্রতি ভালোবাসা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা আবেগ।
ক্লাব ফুটবলের উন্মাদনা
স্টেডিয়ামে সান্তিয়াগোজাতীয় দলের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলও আর্জেন্টিনার সংস্কৃতিতে বিশাল ভূমিকা রাখে। বোকা জুনিয়ার্স ও রিভার প্লেট—এই দুই ক্লাব বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। সান্তিয়াগো নিজে সমর্থন করেন রোসারিও সেন্ট্রালকে। মজার বিষয় হলো, লিওনেল মেসি উঠে এসেছেন তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাব থেকে, আর আঞ্জেল দি মারিয়া এসেছেন রোসারিও সেন্ট্রাল থেকে। কথা প্রসঙ্গে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, আপনাদের দেশেও কি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে আমাদের মতো এত তর্ক-বিতর্ক হয়? প্রশ্নটি শুনে সান্তিয়াগো হেসে ফেললেন। তিনি বললেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্যই আছে, তবে সেটি ফুটবলের সৌন্দর্যেরই অংশ। ব্রাজিল হারলে আমাদেরও ভালো লাগে, কিন্তু সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে নিজের দলের জয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সমর্থকেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যেভাবে আবেগের বহিঃপ্রকাশে রূপ দেন, আর্জেন্টিনায় বিষয়টি কিছুটা আলাদা। কারণ ব্রাজিল তাদের প্রতিবেশী দেশ। দুই দেশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান রয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত ঘিরে বিস্তৃত আমাজন অরণ্যও এক ভৌগোলিক বন্ধনের প্রতীক। তাই মাঠের খেলায় উত্তেজনা, তর্ক কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সৌহার্দ্যের জায়গায় কোনো ঘাটতি নেই।
ফুটবল আর খাবার আর্জেন্টাইন সংস্কৃতির আরেক দিক
চোরিপানখাবার ও ফুটবলের সম্পর্ক নিয়েও কথা হলো। বাংলাদেশে যেমন বড় ম্যাচ মানেই বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া; আর্জেন্টিনায়ও খাবার গুরুত্বপূর্ণ তবে একটু ভিন্নভাবে। সান্তিয়াগোর মতে, ম্যাচের আগে বা পরে স্টেডিয়ামের বাইরে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো চোরিপান (গ্রিল করা মোটা সসেজ ব্রেডের ভেতরে দিয়ে বানানো এক ধরনের স্যান্ডউইচ) ও বিশেষ ধরনের পানীয় মালবেক। বলা যায় চোরিপান ও মালবেক আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়াও আসাদো এবং এম্পান্ডা বিখ্যাত হলেও সেগুলো বেশি সামাজিক আড্ডার খাবার, ম্যাচ দেখার খাবার নয়। খেলা দেখার সময় প্রায় আমরা বলি “তোমার দল হারলেও অন্তত ম্যাচের পরে একটা ভালো চোরিপান তোমাকে সান্ত্বনা দিতে পারে,” হেসে বললেন তিনি।
বাংলাদেশে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা জানাতে খুব বেশি সময় নেননি সান্তিয়াগো। বললেন, এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। শিক্ষকের রুমে ঢুকেই তিনি দেখেন, বিশাল একটি বাংলাদেশের পতাকার নিচে ঝুলছে আর্জেন্টিনার পতাকা। চেয়ারের ওপর রাখা মেসির তোয়ালে। তিনি আর্জেন্টিনা থেকে এসেছেন জানতে পেরে শিক্ষক এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন যে ঠিকভাবে কথাই বলতে পারছিলেন না। এরপর শিক্ষক তাঁকে নিজের বাসায় আমন্ত্রণ জানান।
সান্তিয়াগো বললেন, “তিনি বাসায় ফোন করে বললেন, একজন আর্জেন্টিনার মানুষ আসছে, সবাই আর্জেন্টিনার জার্সি পরে প্রস্তুত হও।” বাসায় গিয়ে তিনি দেখেন, পুরো পরিবার আর্জেন্টিনার জার্সি পরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে।
“আমি তো কোনো খেলোয়াড় নই, শুধু আর্জেন্টিনা থেকে এসেছি। তবু তিনি আমাকে জার্সিতে স্বাক্ষর দিতে বললেন, যেন আমি তাঁর শৈশবের কোনো নায়ক।”
এই অভিজ্ঞতা সান্তিয়াগোকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। আড্ডার ফাঁকে আমি জানতে চাই চা না কফি? সান্তিয়াগো হেসে বলেন, শুধু একটু উষ্ণ পানি হলেই চলবে। কারণ তাঁর সঙ্গে আছে আর্জেন্টিনার অত্যন্ত প্রিয় পানীয় ইয়ার্বা মাতে। আড্ডায় বসে একটি পাত্র থেকেই সবাই মাতে পান করেন; এটি শুধু পানীয় নয়, তাদের সামাজিক বন্ধনেরও অংশ। আমিও সেই পানীয়ের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করিনি।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম যে কতটা গভীর, তার প্রমাণ মেলে আরেকটি ঘটনায়—আর্জেন্টিনার দূতাবাস বাংলাদেশে পুনরায় চালু হয়েছে গত বিশ্বকাপের পর। ফুটবলকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক যে কতটা উষ্ণ হয়েছে, এটিও তার এক প্রতীক। বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব বিশাল। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা। কিন্তু ফুটবল এমন এক শক্তি, যা এসব পার্থক্য মুছে দিতে পারে। সান্তিয়াগোর ভাষায়, “ফুটবল পৃথিবীর একমাত্র খেলা, যা এমন সংযোগ তৈরি করতে পারে।” হয়তো এ কারণেই আর্জেন্টিনার এক ভ্রমণকারী ঢাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের দেশকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। আর বাংলাদেশ আবারও প্রমাণ করে, ভালোবাসার কাছে দূরত্ব কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।