কীভাবে, কার হাত ধরে শুরু হলো বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত সেলিব্রেশন

· Prothom Alo

নরওয়ের ফুটবলার ও সমর্থকদের অভিনব এই সেলিব্রেশন এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি। এর শুরু কীভাবে, কার হাত ধরে জানেন কি?

এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত সেলিব্রেশন 'রু' বা 'ভাইকিং রো'। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়িয়ে সবার মুখে মুখে এখন 'রু'। নরওয়ের ফুটবলার ও সমর্থকদের প্রত্যয়, উল্লাস ও জয়ের আনন্দ প্রকাশের এই অভিনব মাধ্যম এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি।

Visit moryak.biz for more information.

সবখানেই 'ভাইকিং রো'

বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরই ফুটবলকে উপহার দেয় নতুন কিছু স্মৃতি। কখনো স্লোগান, কখনো গান, আবার কখনো গ্যালারির অভিনব উদযাপন ছাপিয়ে যায় মাঠের অনেক ঘটনাকেও। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই আলোচিত ঘটনা ভাইকিং রো।

সবখানেই 'ভাইকিং রো'
@brfootball Norway fans bringing the Viking Row to NYC (via mr.row.row/IG) #norway #worldcup #fifaworldcup #timessquare #fifaworldcup2026 ♬ original sound - B/R Football

মাঠ আর গ্যালারি থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, সাবওয়ে স্টেশন, এস্কেলেটর, রাস্তা, ফ্যান জোন; অর্থাৎ যেখানেই নরওয়ের সমর্থকেরা জড়ো হয়েছেন, সেখানেই দেখা গেছে একই দৃশ্য। এমনকি নরওয়েজিয়ান এমপিরাও পারলামেন্টে মেতেছেন 'রু' ধ্বনিতে।

কী এই ভাইকিং রো?

নামের মাঝেই লুকিয়ে আছে এর পরিচয়। সমর্থকেরা পাশাপাশি বসে দুই হাত সামনে-পেছনে এমনভাবে নাড়েন, যেন তাঁরা একটি বিশাল ভাইকিং লংশিপের বৈঠা চালাচ্ছেন। অনেকটা আমাদের নৌকা বাইচের মতো। সঙ্গে যোগ হয় হাততালির ছন্দ, ঢাকের তাল। আর নরওয়েজিয়ান ভাষায় একসঙ্গে ধ্বনিত হয় রু—অর্থাৎ, রো বা বৈঠা চালাও।

লাল জার্সি পরা হাজারো মানুষ যেন স্টেডিয়ামকে নৌকার মতো একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন

শুরুতে কয়েকজন সমর্থক ছন্দ ধরলেও মুহূর্তের মধ্যেই পুরো গ্যালারি সেই তালে দুলতে থাকে। ওপর থেকে দেখলে মনে হয়, লাল জার্সি পরা হাজারো মানুষ যেন স্টেডিয়ামকে নৌকার মতো একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দৃশ্যটি এতটাই দৃষ্টিনন্দন যে, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও সব দেশের সব মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।

কীভাবে এলো ভাইকিং রো?

ফুটবল মাঠে ভাইকিং রো কোনো প্রাচীন রীতি নয়। এটি আধুনিক ফুটবল সমর্থকদেরই উদ্ভাবন।

এই সেলিব্রেশন জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব দেওয়া হয় নরওয়ের সমর্থক ওলে ফ্রয়স্তাদকে। ইন্সটাগ্রামে সে পরিচিত মিস্টার রো রো নামে। ২০২৫ সালে নরওয়ের অফিসিয়াল সমর্থকগোষ্ঠী 'ওলিয়েবের্গেত'-এর মধ্যে ওলে ফ্রয়স্তাদ এই রু-এর ধারণা দেন। তারপর এবছর মার্চে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে প্রথম বড় পরিসরে দেখা যায় 'ভাইকিং রো'।

ওলে ফ্রয়স্তাদ এই রু-এর ধারণা দেন

তিনি ভাবছিলেন, নরওয়ের পুরুষ ফুটবল দল সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৯৮ সালে। ২৮ বছরের দীর্ঘ বিরতির কারণে একটি পুরো প্রজন্ম কখনোই বিশ্বকাপের গ্যালারিতে নিজেদের দলকে সমর্থন করার সুযোগ পায়নি। ফলে বিশ্বকাপ ঘিরে নরওয়ের সমর্থকদের নিজস্ব কোনো পরিচিত উদযাপন বা সমর্থক-সংস্কৃতিও গড়ে ওঠেনি। তাই একটি সমবেত উদযাপন প্রয়োজন।

View this post on Instagram

A post shared by Ole Frøystad (@mr.row.row)

সেই শূন্যতাই পূরণ করেছে ভাইকিং রো।

ওলে ফ্রয়স্তাদ ফিফাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ভাইকিংরা যখন লংশিপে চড়ে যুদ্ধে যেত, তখন সবাই একসঙ্গে বৈঠা চালাত। আর এমন ধ্বনি করে নিজেদের চাঙা রাখত। আমাদের খেলোয়াড়রাও এখন ঠিক একই কাজ করছে। তাঁদের অনুপ্রাণিত করতে আমার মনে হয়, জাতীয় দলের এমন একটি স্বতন্ত্র সেলিব্রেশন খুব প্রয়োজন ছিল।

অতীতের বৈঠা, বর্তমানের উচ্ছ্বাস

এই উদযাপনের অনুপ্রেরণা এসেছে ভাইকিং ইতিহাস থেকে। যদিও ভাইকিং রো আধুনিক ফুটবল সংস্কৃতির সৃষ্টি। কিন্তু এর অনুপ্রেরণা এসেছে নরওয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাস থেকে।

রো উদযাপনের অনুপ্রেরণা এসেছে ভাইকিং ইতিহাস থেকে।

অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভাইকিংরা দীর্ঘ কাঠের লংশিপে করে ইউরোপ, উত্তর আটলান্টিক এমনকি উত্তর আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত অভিযান চালিয়েছিলেন। সেই জাহাজ এগিয়ে যেত শত শত নাবিকের একই ছন্দে বৈঠা চালানোর শক্তিতে। ফুটবল মাঠের নতুন এই উদযাপন নিজেদের শেকড়কে মনে করারই অংশ।

সেনেগাল ম্যাচের পর বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা

গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে ৩–২ গোলে হারিয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে নরওয়ে। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়েরা গ্যালারিতে উঠে সমর্থকদের সঙ্গে একসঙ্গে ভাইকিং রো করেন। মার্টিন ওডেগার্ড–এর নেতৃত্বে আর্লিং হলান্ডসহ পুরো দলের সেই উদযাপনের ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইকিং রো উদযাপনের ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর থেকে ভাইকিং রো শুধু একটি সেলিব্রেশন নয়, বরং নরওয়ের বিশ্বকাপ অভিযানের অন্যতম পরিচয়ে পরিণত হয়। রাউন্ড অব ৩২–এ আইভরিকোস্টের বিপক্ষে জয় পেয়েও নরওয়েজিয়ানরা মেতেছিলেন রু ধ্বনিতে।

গ্যালারি ছাড়িয়ে পার্লামেন্টেও

ভাইকিং রো-র বিস্তার শুধু স্টেডিয়ামেই থেমে থাকেনি। একটি বেসবল ম্যাচেও এই উদযাপন দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে।

ভাইকিং রো-র উন্মাদনা পৌঁছে যায় নরওয়ের পার্লামেন্ট ভবন স্টোরটিং-এও

উন্মাদনা পৌঁছে যায় নরওয়ের পার্লামেন্ট ভবন স্টোরটিং-এও। জাতীয় দলকে শুভকামনা জানাতে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা একসঙ্গে ভাইকিং রো করেন। পরে এতে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী এবং রাজপরিবারের সদস্যরাও। একটি ফুটবল-উদযাপন যে এত দ্রুত জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে রূপ নিতে পারে, তার বিরল উদাহরণ এটি।

কেন এত জনপ্রিয়?

ভাইকিং রো-র জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর সরলতা আর জাতীয় আবেগ। মানুষ তার পূর্বপুরুষের কথা বলতে ভালোবাসে, নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব করতে চায়। এছাড়া এই উদযাপনে যোগ দিতে বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি বসে একই ছন্দে হাত নাড়লেই যে কেউ এর অংশ হয়ে যেতে পারেন।

ভাইকিং রো-র জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর সরলতা আর জাতীয় আবেগ

আরেকটি বড় কারণ এর ভিজ্যুয়াল আবেদন। টেলিভিশনের ক্যামেরা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ভিডিও—সবখানেই এই সম্মিলিত দৃশ্য অসাধারণ আকর্ষণ তৈরি করে।

আইসল্যান্ড ন্যাশনাল ফুটবল টিম-এর থান্ডার ক্ল্যাপ উদযাপন

যেমন ইউইএফএ ইউরো ২০১৬–এ আইসল্যান্ড ন্যাশনাল ফুটবল টিম-এর থান্ডার ক্ল্যাপ বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল, তেমনি ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের পরিচয় হয়ে উঠেছে ভাইকিং রো।

হয়তো এভাবেই মনে থাকবে ২০২৬

হয়তো এভাবেই মনে থাকবে ২০২৬

বছর কয়েক পর ২০২৬ বিশ্বকাপের স্মৃতি রোমন্থন করলে চোখের সামনে ফুটে উঠবে লাল জার্সি পরা হাস্যোজ্জ্বল হাজারো নরওয়েজিয়ান সমর্থক ও ফুটবলারদের একই ছন্দে বৈঠা চালানোর এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

Read full story at source