ভয়

· Prothom Alo

সকালটা হব হব করছে। কিন্তু এর মধ্যেই পুরো বিছানা ভিজে গেছে ঘামে। এমনকি বালিশটাও।

Visit syntagm.co.za for more information.

ফুল স্পিডে ফ্যান চালিয়েও ঘরের ভেতর ঘামছি। ভাইয়ার রুমে এসি আছে, ওখানে যাব কি যাব না ভাবছি, এমন সময় জানালায় টোকা—রবিন! রবিন!!

এ কণ্ঠ কার, জানা আছে আমার।

দাদু তার এলাকার গল্প শোনাত—শৈশবের গল্প। তার লুঙ্গি পরা-হাফপ্যান্ট জীবনের গল্প। এ কণ্ঠের সঙ্গে সে গল্পের শুধু মিল না, আছে আরও কিছু। আছে কিছু রহস্য আর অনেকখানি ভয়।

চুল থেকে টপ করে একফোঁটা ঘাম পড়ল গলায়। আবার টোকা—রবিন! অ্যাই রবিন!!

সাদ্দাম হোসেনের কণ্ঠ, জানি। জানালা এখন খুলতে যাওয়া মানেই…দাদুর ভাষায়—খুলেছ কি মরেছ!

সে তো অনেক অনেককাল আগের কথা। দাদু তখন গ্রামে থাকত। বাস করত পাগলা নদীর পাড়ে। পাগলা নদী নাকি পেরিয়ে যাওয়া যেত একলাফে—আর গেলেই চলে যাওয়া যেত ভিনদেশে। সেখানে এত এত ফুলের বাগান। লাল-কমলা-হলুদ ফুল। বাগানের মাথার ওপর ঝাঁক ঝাঁক প্রজাপতি। কী যে সুন্দর সেসব দেখতে! কিন্তু ওসব দেখে মুগ্ধ হলেই হয়েছে…আছে তোমার খবর!

কী খবর?

দাদু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলত, বিরাট খবর দাদু। তুমি যদি পাগলা নদীর ওপারের মাধুর্য দেখে…

মাধুর্য কী?

আচ্ছা… শোনো… ওই বাগানের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাও, আর আফসোস করে কোনো একবার বলেই ফেলো, আহারে, পারতাম যদি ওইখানে যেতে, তাহলেই হয়েছে…

কী হয়েছে?

ওই কথা তখন ভোলারা শুনে ফেলে আর ফেললেই সব শেষ।

ভোলারা কী?

ভোলারা হলো প্লুরাল। ভোলা হলো সিঙ্গুলার। অশরীরী। মিশে থাকে বাতাসে। মিলে থাকে ছায়ায়। নিতে পারে যে কারও চেহারা। ঢুকে যেতে পারে মাছের শরীরে, হয়ে যেতে পারে ভ্যা ভ্যা ডাকছাড়া করুণ ছাগলও।

রবার্ট ব্রুস

ছাগল হয়ে কী করে? তাকে তো মানুষ তখন কেটে খেয়েই ফেলবে।

দাদু হাসে ফোকলা দাঁতে। চশমা খুলে মুছে নেয় পাঞ্জাবি দিয়ে। বলে, তার চেয়েও যে ভয়ানক ব্যাপার দাদাজান, ভোলারা যে মানুষ হয়ে যেতে পারে!

আমার খুবই অবিশ্বাস হয়—মানুষ হওয়া অত সহজ নাকি? আম্মু-আব্বু প্রতিদিন আমাকে দশবার করে বলে, কবে যে তুই মানুষ হবি…কবে যে তুই পাবি মানুষের মতো জ্ঞান!

জন্মে এই ১৬ বছর বয়স হওয়ার পরও যখন মানুষ হতে পারছি না, ভোলারা নিমেষে মানুষ হয়ে যাবে কীভাবে? এটা কি কোনো জোক?

দাদু বলে, তাহলে শোনো রবি…আমার এ গল্প শতভাগ খাঁটি। মনে রেখো, এই দুনিয়ায় শরীরের সঙ্গেই থাকে অশরীর, কায়ার সঙ্গেই থাকে ছায়া আর আলোর মধ্যেই থাকে অন্ধকার…এই ভুবনের সঙ্গেই থাকে আমাদের অজানা অন্য এক ভুবন। সেই ভুবনের বাসিন্দা এই ভোলারা! শুনবে আমার পুরো গল্পটা? তৈরি তো?

আমি শুধু মাথা নাড়াই। দাদুর চোখে যেন সাঁতার দিয়ে ওঠে সময়ের সমুদ্র। এ গল্প ভোলার, এ গল্প টোকার, এ গল্প পাগলা নদীর।

নদীর নাম পাগলা কে রেখেছে, কে জানে! এত সরু এক নদী, পাগলামি দূরের কথা—নেই নিতান্ত দুরন্তপনাও। এই নদীর পাড়ে কাটে আমার সময়। তখন তোমাদের মতো এত বাহারি প্যান্ট-শার্ট-গেঞ্জি ছিল না কিন্তু আমাদের—ক্লাস সেভেনে পড়ি। হাইস্কুলের ওই খাকি প্যান্ট আর সাদা শার্ট। বাকি সময়ে আমাদের সবার পরনে লুঙ্গি। গা খালি। লুঙ্গি কাছা মেরে আমরা কাদার ভেতর হাত দিয়ে কই মাছ ধরি। কইয়ের যে কী কাঁটা, আর এমন বিষ… কোনো দিন সে কাঁটা যদি আঙুলে খাও, বুঝবে রাত পার হলেও ব্যথা দূর হয় না। এসব ব্যথাট্যথার অবশ্য ওষুধও আছে। আকন্দগাছের রস। গোল গোল বড় বড় পাতার এ গাছ। পাতার ডাল ছিঁড়লে ঘন দুধসাদা রস বের হয়। কী যে আঠালো! সে রস ঘায়ে লাগালে, যেকোনো ক্ষততে দিলে—ঘা সেরে যায়, ক্ষত শুকিয়ে যায়! আকন্দগাছে ছেয়ে আছে পাগলা নদীর এপার। হাত-পা কাটলে, কই-শিংয়ের কাঁটা খেলেই গাছের কাছে ছুটি। অথচ পা দুটি ছুটে যেতে চায় ওপারে।

কী আছে ওপারে, এ প্রশ্ন না করে বলা যায়, কী নেই ওপারে!

এই তো, এই এক লাফের সমান পাগলা নদী। সেটা পেরোতে আমাদের গলাও ভেজে না। অথচ পেরোনো যায় না। ওপারে যেতে এপারের নিষেধ। ওপার নাকি পিশাচপুরী।

এখন আবার বোলো না যে পিশাচ কী? তোমরা তো এখন জম্বি চেনোই। ওই যে মরে গিয়েও যারা মরে না, বেঁচে থেকেও যারা বেঁচে থাকে না। সিনেমায় খুব মারকাটারি করে। পিশাচও ধরতে পারো একই ধরনেরই কিছু। আমাদের সময় বাবা এই জম্বি ড্রাকুলার ছবিটবি, সিনেমা-টিনেমা ছিল না। আমাদের যা ছিল সব আসল। আসল দৈত্য, আসল দানো, আসল শাঁকচুন্নি, আসল পিশাচ। আর সবচেয়ে যা ভয়াবহ, তার নামই তোমরা শোনোনি— সে হলো ভোলা।

ভোলার নিজস্ব কোনো আকার নেই, আকৃতি নেই। কোনো কোনো রাতে অবশ্য তাদের দেখা যেত। তা-ও অনেক অনেক দূরে। এক সার হয়ে কিছু আগুন চলে যাচ্ছে—গ্রামের বড়রা বলত, ওই যে দেখো, ভোলা যাচ্ছে!

বড়রা ভোলা দেখিয়েই যে শুধু ক্ষান্ত হতো, তা তো নয়—পইপই করে বলে দিতে পাগলা নদীর ওই পারে কখনোই যেন না যাই আমরা।

তবে মানুষকে যা নিষেধ করা হয়, তাতেই তো তার আগ্রহ। বয়স কম হলে সেটা থাকে আরও বেশি। পাগলা নদীর এপারে মাছ ধরতে ধরতে আমরা ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে থাকতাম ওপারের দিকে। আমরা মানে আমি বিশেষত শহীদুল। আমার সঙ্গেই স্কুল যায় সে। অঙ্কে খুবই কাঁচা। ৭ থেকে ৮ বাদ দিতে বললে সে শুধু আকাশ নয়, যেন মহাকাশ থেকেই পড়ে!! তার প্রশ্ন সহজ-সরল। ওপারের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে বলে, অ্যাহ, বললেই হলো? ওইটা কী করে পিশাচপুরী হয় রে জামাল? দিব্যি এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি আমগাছ…পাতা দেখে বলে দিতে পারি ওই গাছগুলো ফজলি আমের। এই এত্ত বড় বড় হবে আমগুলো দেখিস…

‘হলে আমারই-বা কী, আর তোরই-বা কী?’

‘কী মানে? আমগুলো পেড়ে এনে এখন ভর্তা খেতে কী ভালো লাগবে জানিস? তিন থাল ভাত সেঁটে দেওয়া যাবে।’

‘রহমত চাচা কী বলেছে মনে নেই? ওই আমবাগান আসলে আমবাগান নয়। ওইটা হলো মায়া।’

‘কিসের মায়া?’

‘আরে পিশাচরা তাদের পুরীতে যেন লোভে পড়ে মানুষ ঢুকে পড়ে, এ জন্য মায়ার বাগান করে রেখেছে, বুঝলি? বাগানও মায়ার, আমও মায়ার। না হলে এখন কি এমন সময় যে গাছগুলোর আম এমন বড় বড় হয়ে গেছে?’

বাবেলের কুকুর

শহীদুল চুপ করে যায়। তারপরই হঠাৎ যেন বিরাট এক ভেদ পেয়েছে এমনভাবে চিৎকার করে ওঠে—জাত! ভালো জাত তাহলে আমগুলোর। অমন জাত আমাদের গাঁয়ে নেই।

এবার চুপ করে যাই আমি নিজেই। ঘটনা তো এটাও হতে পারে। পিশাচপুরীর আমের জাত নিশ্চয় অন্য রকম কিছুই হবে। কিন্তু যদি মায়া হয়—যেমন রহমত চাচা বলেছে।

আমরা দুজন তখন পাই একটাই উপায়ান্তর!

রহমত চাচা গোলগাল মানুষ। মিষ্টি বানায়। সারা জীবন একটা মিষ্টিই বানিয়েছেন। ছানা জিলাপি। বানাতে বানাতে চেহারা হয়ে গেছে ছানা জিলাপির মতোই। তার দোকানে বসতেই টিনের দুই থালায় দুটি তালের সমান ছানা জিলাপি হাজির। আমরা উঠি হইহই করে—না না। মিষ্টি খেতে আসিনি।

‘পয়সা দিতে হবে না। খেয়ে বল কেমন লাগছে। ভালো লাগলে দু-দশ গ্রামে জানাস। আমার মিষ্টি তো মাছি ছাড়া কেউ খেতেও আসে না।’

কথা সত্য। এত বছর ধরে লোকটা ছানা জিলাপি বানাচ্ছে—খরিদ্দার খুব বেশি নেই রহমত চাচার। এ গাঁয়ে মিষ্টি কেনে সবাই সোমবার—যেদিন ওই হাট বসে। হাটে আসে দূর গ্রামের মিষ্টিওয়ালারা। তাদের কদর বেশি।

খুশি করতেই চামচ দিয়ে কেটে মিষ্টি ওঠালাম মুখে। খেতে মন্দ না অবশ্য। রহমত চাচা গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে—কেমন?

শহীদুল ফস করে বলে বসল, আমি পিশাচপুরী মানি না। আপনি নাকি বলেছেন আমবাগানটা আসলে মায়ার বাগান, আমি সেটিও মানি না।

রহমত চাচা ছুটে এসে থালা দুটি প্রায় ছোঁ মেরে উঠিয়ে নিল—ও, এ জন্যই তাহলে তোদের এ-মুখো হওয়া।

ঝাঁজের সঙ্গে থালা দুটি ময়লার গামলায় রাখতে রাখতে বলল, তা না মানলে আমার কী? যা তাহলে… পাগলা নদী পেরোলেই তো ওই পুরী…যেতে তো তার ক্রোশকে ক্রোশ পা চালাতে হবে না তোদের। তবে শুনে রাখ, ওই আমবাগান আসলেই মায়ার। জয়নবের ছোট ছেলেটা চলে গেছিল না দুই বছর আগের অমাবস্যায়… আমবাগান তো পায়নি…

‘কী পেয়েছিল তাহলে?’

‘পুষ্কুনি। বিরাট পুষ্কুনি। আর পুষ্কুনি ঘিরে থলবল করে বেড়ানো পিশাচের দল। অবশ্য…’

‘অবশ্য কী?’

‘না থাক। তোদের ওই সব বলা যাবে না। ঠোঁটের নিচে মোচও তো ওঠেনি।’

‘বলেন না। কী দেখেছিল জয়নবের ছোট ছেলেটা?’

ডিউক জনের গল্প—কে

এদিক-ওদিক তাকিয়ে নেয় রহমত চাচা, বুঝতে চায় দোকানে আর কেউ আছে কি না। তা তার দোকানে কবেই-বা কে থাকে? তবু সাবধানের মার নেই ভেবেই হয়তো একেবারে আমাদের মুখের কাছে এসে পড়ে সে। ফিসফিস করে বলে, পরি… পরিরে পরি…

কথার সঙ্গে একদলা থুতু এসে পরির মতোই উড়ে এসে পড়ল আমাদের মুখে। দুজনেই মুখ-চোখ কুঁচকে নিলাম। রহমত চাচা কিছু কথা আর অনেকখানি থুতু উড়িয়ে বলতে থাকল—জয়নবের ছোট ছেলে লুকিয়ে লুকিয়ে চলে গিয়েছিল ও বেলা…কেন গিয়েছিল সেটাও বলি…বেচারা ভুল করে সন্ধ্যার সময় তার চাচাতো ভাইকে বলেছিল, কালকে আম কুড়াতে যাব ভোরে…আমাকে ডেকে নিস। সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় এসব কথা কেউ বলে? ওরা বলেছে আর শুনেছে ভোলা। আর যায় কোথায়…ঘাড়ে ধরে নিয়ে গেছে পিশাচপুরীতে।

‘কিন্তু ভোলা তো ঘাড়ে ধরে নিয়ে যায় না, শুনেছি নিয়ে যায় ভুলিয়ে?’

‘ভুলিয়ে নিয়ে যাক আর ভালিয়ে নিয়ে যাক, তাতে তোদের কী! নিয়ে যে গেছে, এটাই মোদ্দাকথা। আর গিয়ে কী দেখেছে? পুষ্কুনিভরা পিশাচ। পিশাচ আর পিশাচ। আমাদের এদিকে যখন অমাবস্যা, তখন পিশাচপুরীতে চলছে পূর্ণিমা। চাঁদের আলো গলে গলে পড়ছে পুষ্কুনির পানিতে। টলমল করছে উথলে ওঠা ঢেউ। আর সেই ঢেউয়ে আকাশ থেকে আছড়ে আছড়ে পড়ছে পরি। ঝাঁকে ঝাঁকে পড়ছে। একটার চেয়ে আরেকটা সুন্দর। মধুবালাকে চিনিস, মধুবালার চেয়েও সুন্দর!’

‘সত্যি?’

‘সত্যি না তো কী…গিয়ে জয়নবের ছোট ছেলেকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর না।’

‘বেঁচে আছে? পিশাচপুরীতে যাওয়ার পরও বেঁচে আছে?’

‘বেঁচে গেছে বল। কারণ, একটা পরির ওকে দেখে খুব মায়া হয়েছিল। যে ভোলা ভুলিয়ে ওকে নিয়ে গিয়েছিল তাকে আচ্ছামতো বকেও দিয়েছিল। শুধু ওখান থেকে ফেরার তিন অমাবস্যা পর বেচারার চোখ চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে গেছে। যে শরীর পিশাচপুরীতে গেছে, সে শরীরের কোনো না কোনো ক্ষতি তো হতেই হবে বাবা…দুনিয়া এমনিতেই কঠিন জায়গা, পিশাচের দুনিয়া তো কঠিন রে বাপ!’

রহমত চাচার দোকান থেকে ফিরতে ফিরতে আমি কি শহীদুল কেউই কোনো কথা বললাম না। একদমই চুপচাপ। দুজনের মনে যে কী চলছে, তা বোঝা গেল অবশ্য বেশ কিছুটা পড়ে। একদমই বাজারটা পেরিয়ে হঠাৎই দাঁড়িয়ে গেলাম দুজনে। বললাম, কাল সকালে যাব আমরা ওই আমবাগানে। আম কুড়াতে। ঠিক আছে?

দুজনের বুকেই আসলে পরি দেখার শখ। পূর্ণিমায় আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পুষ্কুনিতে পরি পড়া দেখার শখ। দুজনের এই শখের আলাপের মধ্যে কেউই খেয়াল করলাম না, আমরা যখন কথা বলছি তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ঝিঁঝি পোকা ডাকতে শুরু করেছে। পাকুড়গাছ থেকে খসসস করে একটা পাতা খসেও পড়ল এ সময়। ঝিঁঝি পোকাগুলো হঠাৎই তাদের ডাক থামিয়ে দিল কিছুক্ষণ, তারপর পৃথিবীতে যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে শুরু করল আবার ডাকা।

শুধু পাকুড়গাছের শুকনো পাতাটা কোনো এক বাতাস পেয়ে উড়তে শুরু করল একটু একটু।

টক টক! টক টক!!

কী হলো রবিন…অ্যাই রবিন! যাবি না? উঠস না তুই? ...অ্যাই রবিন!

সাদ্দাম হোসেনের ডাক চলছে। দাদু বলেছিল এমনভাবেই সেদিন ভোরে ডেকেছিল শহীদুল। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বেরিয়েছিল দাদু। তারপর তার সঙ্গে যা হয়েছিল তা বলার মতো না!

বলার মতো না বলে থেমে গেলে হয় নাকি! জিজ্ঞেস করেছিলাম, বলো না তারপর। কী হলো? তুমি বেরিয়েছিলে?

‘সে তো বের হয়েইছিলাম। ওই ডাক শুনে বের হওয়া মানেই বিরাট এক ফাঁদে পড়ে যাওয়া! আমি সে ফাঁদে এমনভাবে পড়লাম যে আর…’

ফাঁদে কি আমিও পড়তে যাচ্ছি? সাদ্দাম হোসেনের ডাক চলছে। হয় তাকে থামতে বলা দরকার, না হয় বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়া দরকার। টক করে এবার জানালায় শব্দ হতেই আমি মোবাইল ছুড়ে দিলাম জানালার। ঝনঝন ধরনের শব্দ হলো এবার। মোবাইলই ভেঙে গেল কি না কে জানে! ভাবলাম চিৎকার করে বলি, কোথাও যাব না আমি। কাল সন্ধ্যায় যে বলেছি ভোরে উঠে সবার আগে পার্কে যাব…এটা মিথ্যা বলেছি…

পরীক্ষা

কিন্তু কী আশ্চর্য! আমি উল্টো প্যান্ট পরে নিলাম থ্রি-কোয়ার্টারের ওপর। দাদু এমনই বলেছিল, কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না নিজের মধ্যে। দাদু বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর ছেড়ে, আমিও রুম ছাড়লাম। গেটে তালা মারা। চাবি এনে দরজা খুললাম। যেভাবে খুলেছিল দাদু। খুলেই দেখেছিল শহীদুল তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। বলছে, চল চল… দেরি হয়ে গেল…

দাদু বলেছিল, কেন? কয়টা বাজে এখন?

সময় বুঝতেই দাদু আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। আর তখনই দেখেছিল চাঁদটা। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ দাদুর দিকে তাকিয়েই যেন হাসছে। কী আশ্চর্য! ভোরবেলা এই মধ্য আকাশে চাঁদ কেন? আকাশও তো কালো। দাদু ভালো করে খেয়াল করে দেখল শুধু আকাশ না, তার চারপাশই কালো। দাদুর কণ্ঠ এবার কেঁপে উঠল—ভো…ভোর হয় নাই? ফজর হয় নাই?

শহীদুল হাসল তাতে একটু। তারপর অদ্ভুতভাবে বলল, যত আগে যাবি, তত বেশি পরি দেখতে পাবি, জামাল। চল…

এবার দাদুর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান শহীদুলের। ওদিকে একই রকম অদ্ভুত হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছে সাদ্দাম হোসেন—চল…চল দেরি হয়ে যাচ্ছে!

আমি আকাশের দিকে তাকাই। না, চাঁদ নেই। আশপাশও ফকফকা। রাস্তাটা একটু দূরে। চায়ের দোকান খুলছে একজন। কণ্ঠ আমারও কেঁপে উঠল তবু —ফজর হইছে?

‘কবেই হইছে…চল…’

সাদ্দাম হোসেন আমার হাত ধরে। ওদিকে পাগলা নদীতে টেনে নিয়ে যায় দাদুকে। ঝপাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে দাদু। যে নদী একলাফে পার হওয়া যায় সে নদীতে ডুবতে বসে দাদু। বিস্তর পানি খায়। যে নদীতে শেওলা আটকে থাকে, কচুরি আটকে আটকে যায়, সে নদীতে ওঠে হঠাৎ স্রোত। ভাসতে থাকে দাদু। পানির তীব্র টানে ভেসে যেতে থাকে দাদু। শহীদুল তার হাত ধরে থাকে। দাদু খেয়াল করে শহীদুলের চোখের পলক পড়ছে না। দাদু খেয়াল করে শহীদুলের পায়ের পাতা দুটি সোজা নয়।

আমরা দ্রুত হাঁটছি। কোন দিকে হাঁটছি আমি জানি না। আমি খেয়াল করতে থাকি সাদ্দাম হোসেনের পায়ের দিকে। তার পায়ের পাতা সামনের দিকেই ছুটে যাচ্ছে। অসম্ভব গতিতে যাচ্ছে। আমি পেরে উঠছি না। হাঁপাচ্ছি। হঠাৎই আমি থমকে বলে, সাদ্দাম…

সাদ্দাম ঘুরে তাকায়।

আমি সাদ্দামের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। অনেকক্ষণ। সাদ্দাম বলে, কী হইল? আরেকটু দেরি হলে আর পাব না কিন্তু…

আমি তাকিয়েই থাকি। চোখের পলক কি পড়ছে সাদ্দাম হোসেনের?

পাগলা নদীর বেভুল টানে অনেক অনেক দূর ছুটে যায় দাদু। ছুটতে ছুটতে তার দেখা মেলে মরা সাপের ভাসতে থাকা শরীর, শাঁকচুন্নির এলোমেলো চুল, এমনকি পিশাচের খসে পড়া পালকও। আর যখন তারা একটা ঘাটে আটকায়, দাদুকে হ্যাঁচকা টানে টেনে তোলে শহীদুল। দাঁড় করিয়েই বলে, দেখ, ওই যে দেখ...

পার্কের ভেতর ঢুকিয়ে দিগ্‌বিদিক ছোটে সাদ্দাম হোসেন। তার পেছনে আমি। জংলা কিছু গাছের মধ্যখানে নিয়ে সাদ্দাম দাঁড়ায়। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছ। গাছের নীলচে পাতায় কেবল উঠতে ধরা সূর্যের লালচে আভা। সাদ্দাম বলে, দেখ, ওই যে দেখ...

দাদু তাকিয়ে দেখে দিগন্তজুড়ে সূর্যমুখী ফুল। মাথা নুইয়ে তাকিয়ে আছে পুবে। অনেক দূর থেকে আজান ভেসে আসতে থাকে। মৃদু বাতাসে নড়তে থাকে ফুলগুলো।

আমি বলি, ‘আর কিছু দেখোনি দাদু?’

দাদু হাসে।

আমি বলি, ‘পিশাচ দেখছ দাদু?’

দাদু হাসে।

আমি বলি, ‘তাহলে কি পরি দেখছিলে দাদু?’

দাদু হাসে।

আমি বলি, ‘দাদু, শহীদুল কি ভোলা ছিল? উল্টো পায়ের পাতা, অপলক চোখ...শহীদুল কী ছিল দাদু?’

দাদু বলে, ‘ভয়। শহীদুল ভয় ছিল।’

সাদ্দাম আঙুল তাক করে। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘দেখতে পাচ্ছিস?’

বড় এক গাছের কোটরের সামনে বসে আছে সেটা। জ্যান্ত মানুষের কাটা মুখ। অল্প অল্প নড়ছে।

‘কী ওইটা?’

‘পিশাচ। সকালের আলো ফুটতেই মিলিয়ে যাবে বাতাসে।’

পিশাচটা এবার ডানা ঝাপটাল। আলো ফুটে উঠছে। পিশাচটা এবার একটু একটু পিছিয়ে যেতে শুরু করল। আমরা তাকিয়ে আছি। চোখের পলক পড়ছে না আমাদের।

কোটরে ঢুকতেই বুঝলাম, ‘ওটা পিশাচ না। ওটা প্যাঁচা। খুব বড় আর সুন্দর একটা প্যাঁচা। আর বাকিটা, দাদু যেমন বলেছিল—ভয়!’

বিটকেলে বুট

Read full story at source