জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে: এ ভালোবাসার তৃষ্ণা মিটে কি গালিব
· Prothom Alo

ক্যারোলিন পেশায় একজন প্রভাবশালী ডাক্তার। বিধবা এই নারীর দুই মেয়ে। স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। কিন্তু তার চেনা জীবনের বাইরে ঘটে যাচ্ছে এক মহাপরিকল্পনা, যা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তার ওপরে আসা একের পর এক বিপদ থেকে, বহুকাল ধরে কেউ একজন রক্ষা করে যাচ্ছে। বড় মেয়ে অগ্নিজিতাকে ঘিরেই এই গল্পের শুরু—তার বড় মেয়েকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। ক্যারোলিন যা জানে আর যা জানে না, তার মধ্যে যে বিশাল তফাত, তা ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে। তিনি সংসার, চাকরি আর দুই মেয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও তার চারপাশের ঘটনাগুলো তাঁকে টেনে নিয়ে যায় এক অজানা অন্ধকার পথে।
হুট করেই ডাক্তারের জীবনে আসে শাওন নামের এক অদ্ভুত ছেলে। সোজা বাংলায় সে এক বিশেষ ওষুধের দালাল। প্রথমে তাকে নিয়ে দোটানায় পড়তে হয় ক্যারোলিনকে। কিন্তু কে এই শাওন? কেন তার জীবনে এল? কবে এল? কিছুটা পথ পেরোলেই বোঝা যায়, এই চরিত্র গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে আসে। শাওনের ক্যারোলিনকে ভালো লাগে। সে তার ভালোবাসা প্রকাশ করে মির্জা গালিবের ভাষায়, ‘জান তুম পার নিসার করতা হুঁ, ম্যায় নেহি জানতা দুয়া ক্যা হ্যায়’।
এই লাইন যেন তার মনের কথা, ক্যারোলিনের উদ্দেশেই বলা। মায়া, নির্মমতা আর স্বার্থের দ্বন্দ্বে শাওন এক জটিল চরিত্র হয়ে উঠেছে।
Visit freshyourfeel.com for more information.
অগ্নিজিতাই এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে অপহরণ করা হলে। তাকে উদ্ধারের জন্যই ঝাঁসির রানি ফোন করে সন্ন্যাসীকে। তবে পুরো গল্পে, অগ্নি সম্পর্কে তথ্য খুব কম—যেটা থাকলে ভালো লাগত। কারণ, এই মেয়েকে ঘিরেই রহস্য জমে উঠেছে, জেগে উঠেছে ঘুমন্ত এক পাপের সাম্রাজ্য।
কে তাকে অপহরণ করল, কোথায় সে, কে তার উদ্ধার করবে, কী স্বার্থে, আর উদ্ধারের বিনিময় মূল্যই–বা কী? এই প্রশ্নগুলো বারবার ফিরে আসে। অগ্নিজিতার উপস্থিতি গল্পের ভিত। কিন্তু লেখক তাকে কেন পর্দার আড়ালে রেখেছেন? কেন তার উপস্থিতি এত কম?
ক্যারোলিনের ছোট মেয়ে রিমঝিম কিশোরী হলেও হ্যাকার। দুনিয়ার তাবড় তাবড় ওয়েবসাইট হ্যাক করা তার বাঁ–হাত কা খেল। মাত্র ক্লাস থ্রিতে পড়তে গিয়েই সে আবিষ্কার করে এক সত্য; সেই সত্য খুঁজতেই তার হ্যাকার হওয়া। রিমঝিমের ডায়েরির পাতায় একটা নাম, একটা ফাইল থেকে ক্যারোলিনের মাথা ঘুরে যায়। রিমঝিমের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অদম্য কৌতূহল ও প্রতিভা। সে বোনের উদ্ধার কিংবা মায়ের অতীত অথবা বাবার বিষয়ে বিন্দুমাত্র তথ্য—কোনো কিছুই হাতছাড়া করতে চায় না। তার হ্যাকিং দক্ষতা কত দূর কাজে আসে, কীভাবে আসে, কিংবা আদৌ আসে কি না, তা জানতে বইটা পড়তে হবে।
গণতন্ত্রের অপূর্ণতার উত্তর ‘নেতা জনতা ও রাজনীতি’ বইয়ে আছে কীআর তখনই গল্পে আসে সন্ন্যাসী। তার সঙ্গে ঝাঁসির রানি, একটা ফোনকল—সেই ফোনকল ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে দেয়। যেন ধ্যান ভেঙে যায় তার। লাভা আর স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এরপর একে একে চিত্রপটে জড়ো হয় সিরাজ সাঁই, লালন, মোমিন বান্দা, কোতয়াল, দজ্জাল, নিউটন—একের থেকে অন্যজন যেন সাক্ষাৎ ইবলিশের রূপ। ইমাম, মেসায়াহ, সন্ন্যাসী—এরা কোন অবতার রূপে আবির্ভূত হচ্ছে বোঝা দায়। নির্মমতার যে রূপ এই প্রত্যেকে দেখাচ্ছে, তা কল্পনার বাইরে। কারও কাছে বেইমানির শাস্তি, কারও কাছে ইমানদারির পুরস্কার—কিন্তু সবটাই এক অন্ধকার জগতে। আলোর মানুষ তাদের বলা যায় না। মজার ব্যাপার, এই পাষাণদিল চরিত্রগুলোরও কেউ কেউ রুমি-গালিবের শায়েরি পছন্দ করে। আর অগ্নি-শাওন-রিমঝিমরাও কেউ রুমি, কেউ গালিবের ভক্ত।
লেখক আশিকুর রহমান বিশালের হাতে প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে এক অন্য রকম সুন্দর। বইটার প্রচ্ছদ সাধারণ ঘরানার একেবারেই বাইরে—নিউজপেপারের মতো, বেশ আলাদা ধাঁচের আর সুন্দর।
বিবলিওফাইল প্রকাশনীর ফোর হর্সমেন প্রজেক্টের তিনটি বই পড়া হয়েছে। এর মধ্যে এই বইয়ের প্রচ্ছদ আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। তবে কিছু শব্দচয়ন আরও পরিশীলিত করা যেত, যেমন মাতা মেরির সম্বোধন, কী আছে আর কী দিলে ভালো হতো, সেটা পাঠকের জন্য তোলা থাক।
বইটি আরও বিস্তৃত আকারে লেখা সম্ভব ছিল। শুরু থেকেই বইটা বেশ ইন্টারেস্টিং, ঠান্ডা মাথায় ঘণ্টা দুই বসলেই শেষ করা যায়।
যারা মানুষের জান নিতে দুবার ভাবে না, তাদের মতো চরিত্রের, রুমি-গালিবের শায়েরির প্রতি প্রেম তাদের ভেতর এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
সবকিছু মিলে, ভ্রান্তির জগতের ভ্রান্তির যাত্রা হোক তবে?