চামকাঁঠাল আর ডেউয়ার পার্থক্য কী
· Prothom Alo
বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা গাছের নিচে থমকে দাঁড়াতে হলো। মাটিতে পড়ে আছে হলুদাভ রঙের একটা ফল। খানিকটা কাঁঠালের মতো দেখতে, অথচ কাঁঠাল নয়। পাশেই আরেকটা গাছ, তাতেও কাছাকাছি দেখতে একটা ফল ঝুলছে। প্রথমে মনে হলো দুটিই বুঝি একই। কিন্তু নিচে পড়ে থাকা পাকা ফল দেখে বুঝলাম, এগুলো আলাদা। একটা মসৃণ-খসখসে, অন্যটার গায়ে ছোট ছোট কাঁটার মতো দানা। খোঁজ নিয়ে জানলাম। একটা ডেউয়া, আরেকটা চামকাঁঠাল। দেশের গ্রাম এলাকায় বহুকাল ধরে চেনা দুই ফল। এই দুই নাম শহুরে কিশোর-কিশোরীদের অনেকে হয়তো শোনেইনি কোনো দিন।
Visit rouesnews.click for more information.
কাঁঠাল পরিবারের এই দুই সদস্য জন্মায় একই বৃহৎ উদ্ভিদগোষ্ঠীতে, মোরাসি পরিবারে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন Moraceae, আর এর মধ্যে পড়ে কাঁঠাল, ডেউয়া, চামকাঁঠাল, ডুমুরও। একই পরিবারভুক্ত হলেও চেহারা-স্বাদ-ব্যবহারে একেবারে আলাদা এরা। এক পরিবারের ভাইবোনের মতো। চেহারায় হয়তো মিল আছে কিছুটা, স্বভাবে নেই।
ডেউয়ার বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus lacucha। গ্রামবাংলার রান্নাঘরে এই ফলের নাম অচেনা নয় মোটেও। কাঁচা ডেউয়া টক, আর সেই টক স্বাদটাই একে বানিয়েছে আচার-চাটনির প্রিয় উপকরণ। পাকলে রং হলুদ থেকে কমলার দিকে গড়ায়। খোসাটা অমসৃণ, কাঁটাবিহীন—আঙুল বোলালে খসখসে লাগে। যেন মিহি বালিতে হাত ঘষা হচ্ছে। ভেতরে নরম রসাল শাঁস, সঙ্গে কয়েকটা বড়সড় বীজ। গাছটাও বড়সড় হয় সাধারণত, পাতাও প্রশস্ত। প্রবীণ অনেকে এখনো বলেন, শীতের আগে ডেউয়ার আচার বানানো হতো ঘরে ঘরে, রোদে শুকিয়ে বয়ামে ভরে রাখা হতো মাসের পর মাস। সেই স্মৃতি এখন ঘোলাটে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ কোথায় বাস করেচামকাঁঠালের গল্পটা একটু অন্য খাতে বয়। বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus chama। নামেই ইঙ্গিত আছে। ছোট্ট এক কাঁঠাল যেন। আকারে ছোট, কিন্তু কাঁঠালের চেনা কাঁটাযুক্ত খোসাটা ঠিকই বহাল থাকে। একটা পূর্ণবয়স্ক কাঁঠাল ১০-১২ কিলো ওজনের হতে পারে অনায়াসে, চামকাঁঠাল সেখানে হাতের মুঠোয় ধরার মতো ছোট। খোসায় স্পষ্ট বোঝা যায় ছোট ছোট শঙ্কু আকৃতির অভিক্ষেপ। স্বাদটাও মিষ্টি, টকের ছিটেফোঁটা নেই কোথাও। পাকা ফল হিসেবে খাওয়া হয় তো বটেই, কাঁচা অবস্থায় সবজি বানিয়েও রান্না করেন অনেকে। ঠিক যেমন কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তরকারি হয়। মূলত পাহাড়ি ফল এটা, সিলেট আর চট্টগ্রামের টিলাভূমি-বনাঞ্চলে বেশি দেখা মেলে, সমতলের বাজারে চোখে পড়ে কম।
সবুজ পাতার ঘন ছায়ায় প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে চাম কাঁঠালগাছের স্নিগ্ধতা।চেনার সহজ উপায় খুঁজতে গেলে খোসাটাই সবচেয়ে আগে ধরা দেয়। ডেউয়ার খোসা রুক্ষ, খসখসে, কিন্তু কাঁটাবিহীন। পাকা পেঁপের গায়ের মতো অনুভূতি, শুধু রুক্ষতা একটু বেশি। চামকাঁঠালের খোসায় কাঁটা স্পষ্ট, হাত বোলালেই খোঁচা লাগে। স্বাদেও একই রকম ফারাক। ডেউয়া টক-মিষ্টি, বিশেষত কাঁচা অবস্থায় টকভাবটা প্রবল। তাই আচার-চাটনিতে এর কদর। চামকাঁঠাল সম্পূর্ণ মিষ্টি। আকারেও তফাত স্পষ্ট, ডেউয়া মাঝারি গোলাকার আর চামকাঁঠাল দেখতে ছোট এক কাঁঠালের প্রতিরূপ যেন।
এই দুই ফলের গল্প উদ্ভিদবিজ্ঞানের পাতায় আটকে নেই শুধু। গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে এদের নিজস্ব একটা জায়গা আছে। যদিও শহরের বাজারে সেই জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে ক্রমশ। সুপারশপের তাকে আপেল-কমলা যতটা সহজলভ্য, ডেউয়া বা চামকাঁঠাল ততটা নয় মোটেও। অথচ একসময় এই ফলগুলোই ছিল মৌসুমি খাদ্যচক্রের অংশ। বর্ষার আগে-পরে গাছ ভরে উঠত ফলে। শিশুরা গাছতলায় জড়ো হতো, পাকা ফল কুড়িয়ে নিয়ে যেত বাড়িতে। এখন সেই দৃশ্য স্মৃতির খাতায়।
মানুষের রাগ, ভয় আর কষ্ট বুঝতে পারে কুকুর, নতুন গবেষণাArtocarpus গণে ৫০টিরও বেশি প্রজাতি আছে। কাঁঠাল সবচেয়ে পরিচিত মুখ হলেও ডেউয়া, চামকাঁঠালের মতো প্রজাতিগুলো স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে নিজের ভূমিকা রাখে চুপচাপ। পাখি, বাদুড়, বনের ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, সবাই এই ফলের ওপর নির্ভরশীল কমবেশি। ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয় বনের নানা প্রান্তে, প্রকৃতির নিজস্ব চক্র চলতে থাকে নীরবে, কারো নজরে না পড়েই প্রায়।
সমস্যা একটাই। এই স্থানীয় ফলগুলো নিয়ে গবেষণা বা সংরক্ষণের উদ্যোগ এখনো তেমন নেই বললেই চলে। বন উজাড় হচ্ছে, পাহাড়ি জমি পরিষ্কার হচ্ছে চাষাবাদের জন্য, আর তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এমন অনেক গাছ, যা একসময় গ্রামীণ অর্থনীতি আর খাদ্যচক্রের অংশ ছিল। কিশোর বয়সেই এই ফলগুলো চেনার সুযোগ থাকলে হয়তো ভবিষ্যতে সংরক্ষণের প্রয়োজনটাও অনুভব করা সহজ হবে কারও কারও জন্য।
কোনো গ্রামীণ হাটে বা পাহাড়ি বাজারে হলুদাভ, খসখসে খোসার একটা ফল চোখে পড়লে বুঝে নেওয়া যাবে সেটা ডেউয়া। ছোট্ট এক কাঁঠালের মতো, গায়ে কাঁটা, ভেতরে মিষ্টি শাঁস। দেখা গেলে সেটাই চামকাঁঠাল। নাম দুটো শুনতে একরকম লাগে হয়তো, জন্মায় একই গোত্রে। তবু হাতে নিলে, স্বাদ নিলে ফারাকটা টের পাওয়া যায়। গাছতলায় পড়ে থাকা একটা ফল, কতটুকুই–বা তার গল্প। তবু সেই ছোট্ট চেনাটুকু থেকেই হয়তো শুরু হয় একটা বনকে আসলে চেনা।
সূত্র: ন্যাচার ইনফো বাংলাদেশ
৯১ বছর বয়সেও থামেননি ‘গ্রে বিয়ার্ড’, আবারও হাঁটছেন অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলে