রাত জেগে লেখা কবিতা ‘বিদ্রোহী’

· Prothom Alo

‘বল বীর—

Visit playerbros.org for more information.

বল উন্নত মম শির!

শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!

বল বীর—

বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’

চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’

ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া

খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,

উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব–বিধাতৃর!’

যখন ‘বিদ্রোহী’ রচিত হলো

১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। কলকাতার ৩/৪ সি, তালতলা লেনের একটি বাড়ির নিচতলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘর। রাত গভীর হয়েছে। ঘরে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর জ্যেষ্ঠ বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহ্‌মদ। মুজফ্ফর আহ্‌মদ ঘুমিয়ে পড়লেন। নজরুল জেগে রইলেন। সেই রাতেই লেখা হলো বাংলা কবিতার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’।

ঠিক কোন তারিখে, রাতের কোন সময়ে কবিতাটি লেখা হয়েছিল, তা জানা যায় না। তবে মুজফ্ফর আহ্‌মদের স্মৃতিকথা বলছে, রাত দশটার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সকালে উঠে যখন মুখ-হাত ধুয়ে বিছানায় এসে বসেছেন, নজরুল তাঁকে জানালেন, একটি কবিতা লিখেছেন। তারপর পুরো কবিতাটি পড়ে শোনালেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা মুজফ্ফর আহ্‌মদই। তবে নিজের ‘স্বভাবদোষে নিরুত্তাপ শ্রোতা’।

কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা বইয়ে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ লিখেছেন, ‘কোনো দিন কোনো বিষয়ে আমি উচ্ছ্বসিত হতে পারি না।…নজরুল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাকে প্রথম পড়ে শোনাল। অথচ আমার স্বভাবের দোষে না পারলাম তাকে কোনো বাহ্বা দিতে, না পারলাম এতটুকু উচ্ছ্বসিত হতে।…আমার স্বভাবটা যদিও নজরুলের অজানা ছিল না, তবু সে মনে মনে ব্যাহত যে হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই।’

‘বিদ্রোহী’র ছন্দ‘দলমাদল’ নামে একটি ঐতিহাসিক কামানের গায়ে হেলান দেওয়া নজরুল। ১৯২১ সালে ‘বিদ্রোহী’ রচনার দুই বছর পর তোলা হয়েছিল ছবিটি

বড়সড় এ কবিতা লেখা হয়েছিল পেনসিলে। কারণ, নজরুল বা মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ, কারোরই তখন ফাউন্টেন পেন ছিল না। মুজফ্‌ফরের স্মৃতিতে, ‘দোয়াতে বারে বারে কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তার হাত রাখতে পারবে না, এটা ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেনসিলে লিখেছিল।’

ওই দিন একটু বেলা হতেই মোসলেম ভারত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আফজালুল হক ঢুকলেন নজরুলের ঘরে। মোসলেম ভারত-এর মুদ্রিত সম্পাদক ছিলেন শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হক। কিন্তু পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক ও কার্যত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তাঁর ছেলে আফজালুল হক। নজরুল তাঁকেও কবিতা পড়ে শোনালেন। তিনি তো শুনে খুব হইচই শুরু করে দিলেন। বললেন, ‘এখনই কপি করে দিন কবিতাটি, আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।’

আফজালুল হক কপিটি নিয়ে চলে গেলেন। এর কিছুক্ষণ পরে বাসায় এলেন নজরুলের ‘অবিনাশদা’, সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকার অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ তখন বাসায় ছিলেন না। দুপুর ১২টার কিছু আগে ফিরে এলে নজরুল জানালেন, অবিনাশদা এসেছিলেন। তিনি কবিতাটি শুনে বললেন, ‘তুমি পাগল হয়েছ, নজরুল। আফজালের কাগজ কখন বার হবে তার স্থিরতা নেই, কপি করে দাও, বিজলীতে ছেপে দিই আগে।’ তাঁকেও নজরুল সেই পেনসিলের লেখা থেকে কপি করে দিয়েছিলেন।

‘বিদ্রোহী’র শতবর্ষ, জাগরণের শতবর্ষকাজী নজরুল ইসলাম

এখন কবিতাটি তো দুজন নিলেন দুটি পত্রিকার পক্ষ থেকে। কে আগে ছাপলেন?

সাপ্তাহিক বিজলীতেই আগে ছাপা হলো। ডেটলাইন ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি শুক্রবার (২২ পৌষ ১৩২৮ সাল বঙ্গাব্দ)। সে সংখ্যার চাহিদা এত বেশি ছিল যে দুইবার ছাপার প্রয়োজন হয়েছিল।

এখানে কোনো কোনো গবেষক দাবি করেছেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাখানি প্রথম ছাপা হয়েছে মোসলেম ভারত–এর কার্তিক সংখ্যায়। এ বিষয়ে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ লিখেছেন, ‘আফজাল সাহেব কার্তিকের মোসলেম ভারতের জন্য যখন কপি নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন পৌষ মাস ছিল। আমার ধারণা, তাঁর কার্তিক সংখ্যা ফাল্গুন মাসের আগে বার হয়নি।’

এ কারণেই অনেক গবেষকের পক্ষে কার্তিক সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব হয়নি।

তবে বিষয়টি একেবারে বিতর্কমুক্ত নয়। ১৯২২ সালে নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতুতেও মোসলেম ভারত-এর কার্তিক সংখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রচনার সময় সম্পর্কে মুজফ্ফর আহ্‌মদের প্রত্যক্ষ স্মৃতি এবং মোসলেম ভারত-এর অনিয়মিত প্রকাশের তথ্য পাশাপাশি রাখলে ৬ জানুয়ারি ১৯২২-এর বিজলীকেই প্রথম প্রকাশক হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে শক্ত যুক্তি পাওয়া যায়।

নজরুলের যে বইগুলো বাজেয়াপ্ত হয়েছিল

২.

‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির ‘কপি’ করা নিয়ে অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যও খানিকটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। মাসিক বসুমতী পত্রিকায় পুরোনো কথা লিখতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, সেদিন নজরুল কবিতাটি পড়ছিলেন আর তিনি শ্রুতলিখন করছিলেন।

এ বিষয়ে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের মত হচ্ছে, ‘নজরুল কখনো এইভাবে কবিতা ছাপতে দিত না। সে নিজ হাতে কপি করে কবিতা ছাপতে দিত।’ ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ক্ষেত্রেও তা–ই হয়েছিল।

আবার নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু নলিনীকান্ত সরকার, যিনি বিজলী পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এক লেখায় লিখেছেন, তিনিই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি বিজলীতে ছাপানোর জন্য নজরুলের বাসা থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের মতে, এ দাবিও সত্য নয়। অবিনাশবাবুই নিয়ে গিয়েছিলেন। নলিনীকান্তের মনে হয়েছে, যেহেতু তিনি নজরুলের প্রাণের বন্ধু, তারই তো এ কাজ করার কথা! এভাবে স্মৃতি মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

কাজী নজরুল ইসলাম (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬–১২ ভাদ্র ১৩৮৩), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালবিদ্রোহী: বাংলা কবিতার ‘ব্রেক–থ্রু’

৩.

‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার সময় কাজী নজরুল ইসলামের বয়স মাত্র ২২। এর আগে সৈনিকের জীবন শেষ করে তিনি কলকাতায় ফিরে এসেছেন। লেখালেখিতে তাঁর পরিচয় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তাঁর ভেতরে তখন জমা হচ্ছে যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, সামাজিক বৈষম্যের বোধ এবং তারুণ্যের দুর্দমনীয় শক্তি। সেই সময়ের ভারতবর্ষও ছিল অস্থির। অসহযোগ আন্দোলন চলছে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হচ্ছে, ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতি নানা ধারায় বিস্তৃত হচ্ছে। এ সময়েই নজরুলের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো এই কবিতা—‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর—বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!’ যেখানে ব্যক্তি ‘আমি’ ধীরে ধীরে হয়ে উঠল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

এক রাতের নির্জনতায় পেনসিলে লেখা কয়েক পৃষ্ঠা কবিতা ছড়িয়ে পড়ল পাঠকের মুখে মুখে। নজরুল হলেন বিদ্রোহী কবি।

Read full story at source