প্রকৃতির টানে, বন্ধুত্বের গানে, ঝরনা থেকে সাগরপানে
· Prothom Alo

ভ্রমণ শুধু কোনো একটি জায়গায় গিয়ে ফিরে আসার গল্প নয়। ভ্রমণ মানুষকে ফিরিয়ে নেয় পুরোনো দিনগুলোর কাছে, পুরোনো বন্ধুদের কাছে, একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতির কাছে। পথে যেতে যেতে কখনো গল্প জমে, কখনো গান, কখনো আবার হঠাৎ কোনো পুরোনো ঘটনা মনে পড়ে সবাই মিলে হাসিতে মেতে ওঠে। দিন শেষে তখন গন্তব্যের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে পথের গল্পগুলোই।
নোয়াখালী বন্ধুসভার এবারের আনন্দভ্রমণ ছিল তেমনই এক গল্প। গন্তব্য ছিল সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা-২ ঝরনা ও বাঁশবাড়িয়া সি বিচ। সঙ্গে নোয়াখালী বন্ধুসভার পুরোনো-নতুন একঝাঁক বন্ধু, উপদেষ্টা ও কিছু বন্ধুর পরিবারের কয়েকজন সদস্য। আনন্দভ্রমণের স্লোগান ছিল ‘প্রকৃতির টানে, বন্ধুত্বের গানে, ঝরনা থেকে সাগরপানে’।
Visit grenadier.co.za for more information.
২৯ আগস্ট সকাল। মাইজদী টাউন হল মোড়ে একে একে জড়ো হতে শুরু করলেন বন্ধুরা। কারও হাতে ছোট ব্যাগ, কারও চোখেমুখে ভ্রমণের উত্তেজনা। বাস ছাড়ার আগেই যেন শুরু হয়ে যায় আনন্দভ্রমণ।
সকাল ৭টার দিকে বাস যখন মাইজদী ছেড়ে ছুটতে শুরু করল, শহরের পরিচিত দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যেতে থাকে। বাসের ভেতর তখন পরিচিত মানুষগুলোর কোলাহল। কিছুক্ষণ পর মাইক্রোফোন হাতে শুরু হলো পরিচয় পর্ব। সবাই সবাইকে চেনে। তবু নিয়মমতো আরেকবার পরিচয়। সঙ্গে বন্ধুরা বলতে থাকলেন নোয়াখালী বন্ধুসভার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা গল্প। কোনো আয়োজনের কথা, কোনো পুরোনো দিনের ঘটনা, কোনো বন্ধুর মজার কাণ্ড।
কথার ফাঁকে চলছিল গানও। কেউ গান ধরছেন, বাকিরা কণ্ঠ মেলাচ্ছেন। এভাবেই পথটা ছোট হয়ে আসতে লাগল। পথেই ছিল সকালের নাশতার আয়োজন। সবাই মিলে নাশতা শেষে আবার শুরু হলো যাত্রা। এভাবে গান, গল্প, স্মৃতিচারণা আর আনন্দে বাস পৌঁছে গেল প্রথম গন্তব্যের কাছাকাছি, সহস্রধারা–২ ঝরনায়। বাস থেকে নেমে সিএনজিতে করে এগিয়ে যেতে হলো ঝরনার প্রবেশপথের দিকে। এরপর নৌকা করে লেক পার হয়ে শুরু হলো যাত্রা। চারপাশের সবুজ, পাহাড়ি পরিবেশ আর প্রকৃতির নির্জনতা শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে যেন একেবারে অন্য এক জগতে নিয়ে যাচ্ছিল।
ঝরনার কাছে পৌঁছানোর পর আর কারও মধ্যে পথের ক্লান্তি নেই। পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসা পানির ধারা, চারপাশের সবুজ আর বন্ধুদের উচ্ছ্বাস। সব মিলিয়ে মুহূর্তেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠল পুরো এলাকা। কেউ পানিতে নামছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে মাতছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ একটু দূরে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছেন।
অনেক দিন পর একসঙ্গে হওয়া মানুষগুলোর হাসি-আনন্দে সহস্রধারা–২ যেন হয়ে উঠল নোয়াখালী বন্ধুসভারই আরেকটি আড্ডাস্থল। সেখানেই বসে গেল গানের আসর।
কোনো মঞ্চ নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতা। সামনে পাহাড়, পাশে ঝরনার জলধারা। ঝরনার পানির শব্দের সঙ্গে মিশে গেল গানের সুর। কেউ কণ্ঠ মেলালেন, কেউ হাততালি দিলেন, কেউ আবার মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখলেন সেই মুহূর্ত। প্রকৃতির মধ্যে এমন স্বতঃস্ফূর্ত গানের আসর ভ্রমণের আনন্দকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
আনন্দভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি ছিল পুরোনো বন্ধুদের উপস্থিতি। নোয়াখালী বন্ধুসভার বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা সাবেক সভাপতি, উপদেষ্টা ও সিনিয়র অনেক বন্ধু এবার যুক্ত হয়েছিলেন। নতুনদের সঙ্গে পুরোনোদের গল্প, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা বিনিময় হলো।
সাবেক সভাপতি সুমন নূর, শামা আরজু, নিলয় মিলন, কামাল হোসেন, মাহফুজ আহমেদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। একসময় যাঁরা সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনকে এগিয়ে নিয়েছেন, তাঁরাও পুরোনো সময়ের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন।
দুপুর হয়ে গেলে ফেরার সময় হয়। বেলা ১টার দিকে সিএনজিতে করে আবার বাসের কাছে ফিরে আসতে হয়। বাসে করে দুপুরের খাবারের গন্তব্যে। খাওয়াদাওয়া শেষে আবার সবাই উঠে পড়লেন বাসে। ঝরনার জল পেরিয়ে এবার যাত্রা সাগরের দিকে। বাঁশবাড়িয়ায় পৌঁছে আবার সিএনজিতে করে সমুদ্রসৈকতে যাওয়া। সাগরের সামনে পৌঁছানোর পর যেন সবাই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলেন। কেউ পাড় ধরে হাঁটছেন, কেউ ঢেউয়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। কেউ আবার নিজের মতো করে একটু নিরিবিলি সময় কাটাচ্ছেন।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল। সাগরের বাতাসে সারা দিনের ক্লান্তিও যেন অনেকটা হালকা হয়ে গেল।
সাগরপারেও বসে গেল আরেক দফা গানের আসর। সকালের ঝরনার পাশে যে গান শুরু হয়েছিল, বিকেলে যেন তারই দ্বিতীয় অধ্যায়। এবার সামনে ঝরনার শব্দ নেই, আছে সমুদ্রের ঢেউ। সেই ঢেউয়ের সঙ্গে মিলেমিশে আবারও উঠল বন্ধুদের গানের সুর।
এরপর অনুষ্ঠিত হলো গেমিং ইভেন্ট। খেলার সময় যেন সবাই বয়স ভুলে গেলেন। সবার অংশগ্রহণে গেমিং ইভেন্ট জমজমাট হয়ে ওঠে। ছেলেদের গেমিং ইভেন্টে বিজয়ী হন সাবেক সহসভাপতি জাহিদ হাসান, সাবেক সভাপতি ও উপদেষ্টা কামাল হোসেন এবং সভাপতি আসিফ আহমেদ। মেয়েদের গেমিং ইভেন্টে বিজয়ী হন উপদেষ্টা লায়লা পারভীন, বন্ধু সুমাইয়া সুলতানা ও সীমা রানী। খেলায় ছিল প্রতিযোগিতা, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল হাসিঠাট্টা আর আনন্দ।
এরপর মাঠে গড়ায় একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। এক দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সভাপতি ও উপদেষ্টা সুমন নূর, অন্য দলের নেতৃত্বে সাবেক সভাপতি ও উপদেষ্টা নিলয় মিলন। নির্ধারিত সময়ে দুই দলের কেউই গোল করতে পারেনি। গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয় মূল খেলা। পরে টাইব্রেকারে ৩–১ ব্যবধানে জয় পায় নিলয় মিলনের দল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে ফেরার প্রস্তুতি শুরু হলো। সাগরের ঢেউ পেছনে রেখে সবাই আবার সিএনজিতে করে বাসের দিকে ফিরলেন। সারা দিনের ক্লান্তি তখন শরীরে, কিন্তু মনজুড়ে ছিল তৃপ্তি। সকাল থেকে যাঁদের নিয়ে পথ চলা শুরু হয়েছিল, ফেরার সময় একেকজনের বিদায়ে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।
ফেরার সময়ও বাসে আড্ডার কোনো কমতি ছিল না। কেউ গান ধরেছেন, কেউ সারা দিনের কোনো মজার ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার মুঠোফোনে দিনের ছবি দেখছেন। মাইক্রোফোনে আবারও স্মৃতিচারণা। বাইরে তখন ধীরে ধীরে রাত নামছে, আর বাসের ভেতর জেগে আছে গান, গল্প আর হাসি।
এরই মধ্যে বাসে অনুষ্ঠিত হলো র্যাফল ড্র। এই পর্বে ‘লাকি সেভেন’ হিসেবে সাতজন ভাগ্যবান বন্ধু পুরস্কার জিতে নেন। একে একে নাম ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস আর হাততালি। কেউ পুরস্কার পেলেন, কেউ পেলেন না। কিন্তু আনন্দটা ছিল সবার।
বন্ধুরা একে একে সারা দিনের অনুভূতি প্রকাশ করেন। কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা বলেন, ‘নিজ পরিবার ছাড়া এটা আমার জীবনের প্রথম ভ্রমণ। এর আগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও থেকে ভ্রমণে যাওয়া হয়নি। সারা দিন অনেক আনন্দ করেছি।’
উপদেষ্টা লায়লা পারভীন বলেন, ‘যখন আনন্দভ্রমণ হবে শুনলাম, তখন থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম দিনটা কবে আসবে। বন্ধুসভার আনন্দভ্রমণগুলো সব সময় অন্য রকম আনন্দ দেয়। বন্ধুদের আন্তরিকতায় আয়োজন আরও সুন্দর হয়েছে।’
আরও অনুভূতি প্রকাশ করেন বন্ধু ফখরুল ইসলাম ও মাকসুদ হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য রুমাইয়া সুলতানার বাবা ও বন্ধু স্বস্তিকা দাসের বাবা।
রাত ১০টায় বাস ফিরে আসে চেনা শহর মাইজদীতে। একে একে বন্ধুরা সারা দিনের অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরেন। প্রকৃতির দুই রূপ। ঝরনা আর সাগর ছুঁয়ে সেদিন সবাই ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন আরও কিছু নতুন স্মৃতি। একটি দিন শেষ হয়েছে। পথ শেষ হয়েছে। কিন্তু বন্ধুত্বের গল্প; সে তো চলতেই থাকে।
আনন্দভ্রমণে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি সুমন নূর, শামা আরজু, নিলয় মিলন, কামাল হোসেন, উপদেষ্টা লায়লা পারভীন, সাবেক সভাপতি মাহফুজ আহমেদ চৌধুরী, সাবেক সহসভাপতি জাহিদ হাসান, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ হোসেন, সহসভাপতি আব্দুর রহিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নয়ন চন্দ্র কুরী, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক শান্ত চন্দ্র দে, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ফাতেমা কানিজ, কার্যনির্বাহী সদস্য রুমাইয়া সুলতানা, সানজিদা সুলতানা, বন্ধু প্রিয়ারুল ইসলাম, তাহসিন রহমান, সালেহ আহমেদ, সাকিব হোসেনসহ অনেকে।
আয়োজন সহযোগী ছিল রয়েল ট্রাভেলার্স, নোয়াখালী। উপস্থিত ছিলেন রয়েল ট্রাভেলার্স, নোয়াখালীর চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম।
সভাপতি, নোয়াখালী বন্ধুসভা