মিষ্টিমুখের ঐতিহ্য, মিষ্টিতে ভেজালের শঙ্কা

· Prothom Alo

সুখবর থেকে উৎসব, বিয়ে থেকে নতুন যাত্রা, এমন কি মৃত্যু—মিষ্টি বাঙালির আনন্দ ভাগাভাগির চিরচেনা ভাষা। তবে সেই মিষ্টিতেই যখন ভেজালের শঙ্কা, তখন ঐতিহ্যের পাশাপাশি ভাবতে হয় স্বাস্থ্যের কথাও।

Visit newsbetting.cv for more information.

আমাদের এই অঞ্চলে মিষ্টিমুখ করার রেওয়াজ বহু পুরোনো। সুসংবাদে মিষ্টি, জন্মে মিষ্টি, বিয়েতে মিষ্টি, ভালো কাজে মিষ্টি—এমনকি রাজনৈতিক পালাবদলেও মিষ্টি বিতরণের সংস্কৃতি দেখা যায়। অর্থাৎ আনন্দ, সাফল্য ও শুভকামনা প্রকাশের সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক গভীর।
বাংলাদেশে সুসংবাদে মিষ্টি খাওয়ার এই রীতি এক দিনের তৈরি নয়। কৃষি, ধর্ম, সামাজিক রীতি এবং মিষ্টান্ন তৈরির শিল্পের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এই সংস্কৃতি। সেই মিষ্টিমুখের ঐতিহ্য কোথা থেকে এল, আর আজকের মিষ্টিতে ভেজালের ঝুঁকি কতটা—দুই দিকই দেখা যাক।

মিষ্টিমুখের ঐতিহাসিক যাত্রা

প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সূচনা: প্রাচীন বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে ধান ও আখের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আখ থেকে তৈরি হতো গুড়, আর গুড় ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরির চল গড়ে ওঠে। অতিথি আপ্যায়নে ‘গুড়জল’ দেওয়ার মতো রীতিও প্রচলিত ছিল। ধীরে ধীরে মিষ্টি হয়ে ওঠে আপ্যায়ন ও শুভেচ্ছা জানানোর অন্যতম মাধ্যম।

মিষ্টিতে ছানার ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক

ছানার আবির্ভাব ও মিষ্টান্নের পরিবর্তন: মিষ্টান্নের ইতিহাসে ছানার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে ছানা দিয়ে তৈরি নানা মিষ্টি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাংলার বৈষ্ণব সংস্কৃতির বিস্তারের সময় নিরামিষ মিষ্টির ব্যবহার বাড়ে বলে ঐতিহাসিকদের অনেকেই মনে করেন।

আধুনিক মিষ্টান্ন শিল্পের বিকাশ: উনিশ শতকে কলকাতায় ছানাভিত্তিক মিষ্টির বাণিজ্যিক বিকাশ ঘটে। রসগোল্লাসহ বিভিন্ন মিষ্টি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলও নিজেদের স্বতন্ত্র মিষ্টির ঐতিহ্য গড়ে তোলে। টাঙ্গাইল, নাটোর, কুমিল্লা, বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মিষ্টি আজও স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচায়ক।

ধর্ম ও উৎসবের সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক

ঈদের সঙ্গে আছে মিষ্টির সম্পর্ক

মিষ্টির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক শুধু সামাজিক নয়, ধর্মীয় ও উৎসবকেন্দ্রিকও।
হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন পূজা-পার্বণে মিষ্টির ব্যবহার দীর্ঘদিনের। পয়লা বৈশাখে জমিদারি আমলে ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানে প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানোর রীতিও ছিল।

ইসলামি সংস্কৃতিতেও মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের বিশেষ স্থান রয়েছে। ঈদুল ফিতরের সঙ্গে সেমাইসহ বিভিন্ন মিষ্টান্নের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আবার শবে বরাতের মতো উৎসবেও হালুয়া-রুটির মতো খাবার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

কেন সুসংবাদে মিষ্টি?

মিষ্টি আসলে আনন্দ প্রকাশের ভাষা

বাঙালির কাছে মিষ্টি শুধু একটি খাবার নয়, আনন্দ প্রকাশের ভাষা। জন্ম, বিয়ে, নতুন চাকরি, পরীক্ষায় সাফল্য কিংবা কোনো ভালো খবর—সব ক্ষেত্রেই মিষ্টি ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আনন্দকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়।

মিষ্টি দেওয়া মানে শুধু কাউকে খাওয়ানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শুভকামনা, সম্পর্কের মধুরতা এবং সামাজিক বন্ধনের প্রকাশ। কারও সঙ্গে মনোমালিন্য মিটলেও অনেক সময় মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়।

ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির পার্থক্য পেরিয়ে মিষ্টিমুখ তাই বাঙালির সামাজিক জীবনে এক ধরনের সর্বজনীন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

মিষ্টি খাওয়ার স্বাস্থ্যগত দিক

মিষ্টি খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিমাণ। মিষ্টি, বিশেষ করে যোগ করা চিনি বেশি পরিমাণে ও নিয়মিত খেলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ফলের মতো প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি খাবারে চিনি ছাড়াও ফাইবার, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে।

ভালো দিক: চিনি শরীরের দ্রুত শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। গ্লুকোজ মস্তিষ্ক ও পেশির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি। শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের সময় শরীর দ্রুত শক্তির প্রয়োজন অনুভব করলে কার্বোহাইড্রেট তা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নিয়মিত মিষ্টি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। শরীরের প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর বিভিন্ন খাবার থেকেও পাওয়া যায়।

মিষ্টি খেলে সাময়িকভাবে ভাল লাগতে পারে

অতিরিক্ত মিষ্টির ক্ষতিকর দিক: অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত বেশি পরিমাণে চিনি খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় নিয়মিত পান করা এ ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয়।

অতিরিক্ত চিনি হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত। এটি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বেশি চিনি গ্রহণ যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে দাঁতের ক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত চিনি। মুখের ব্যাকটেরিয়া চিনিকে ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করতে পারে।

মিষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য: মিষ্টি খেলে সাময়িকভাবে ভালো লাগতে পারে। চিনি ও সুস্বাদু খাবার মস্তিষ্কের পুরস্কার বা রিওয়ার্ড সিস্টেমকে সক্রিয় করে, ফলে আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। ক্লান্তি বা মানসিক চাপের সময় অনেকের কাছেই মিষ্টি ‘কমফোর্ট ফুড’ হিসেবে কাজ করে।

তবে নিয়মিত অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসের ভালো দিক নেই। রক্তে শর্করার দ্রুত ওঠানামার কারণে কারও কারও ক্লান্তি, ক্ষুধা বা অস্বস্তি বাড়তে পারে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে, যদিও বিষয়টি পুরোপুরি সরল নয়।

মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস অনেকের ক্ষেত্রে ক্রেভিং বাড়াতেও পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়তে পারে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতি, মনোযোগ ও সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

আসল শঙ্কা ভেজালে

মিষ্টি খাওয়ার ক্ষেত্রে চিনির পরিমাণের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মিষ্টিতে কী ব্যবহার করা হচ্ছে। ভেজাল বা অনিরাপদ উপাদান ব্যবহার করলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

মিষ্টিতে ভেজাল দেওয়া হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে

নিম্নমানের উপকরণ, অনিরাপদ রং, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ কিংবা অনুমোদনহীন রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মিষ্টি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। এসব উপাদান নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই মিষ্টি কেনার সময় পরিচিত ও বিশ্বস্ত দোকান বেছে নেওয়া, অস্বাভাবিক রং বা গন্ধযুক্ত মিষ্টি এড়িয়ে চলা এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা মিষ্টি না খাওয়াই ভালো।

পরিমিতিই মূল কথা

মিষ্টি একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাঝে মাঝে অল্প পরিমাণে মিষ্টি খেলে সাধারণত সমস্যা হয় না। তবে মিষ্টিকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত না করাই ভালো। মিষ্টি, কেক, চকলেট, কোমল পানীয় ও প্যাকেটজাত মিষ্টি পানীয়ের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা অন্য কোনো বিপাকীয় সমস্যা রয়েছে, তাঁদের মিষ্টি খাওয়ার বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা উচিত। সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

মিষ্টিমুখ আমাদের সংস্কৃতির আনন্দময় একটি অংশ। সেই ঐতিহ্য থাকুক, তবে মিষ্টির পরিমাণ ও মানের ব্যাপারে সচেতন থাকাও জরুরি। কারণ মিষ্টির আনন্দ যেন কখনো স্বাস্থ্যের জন্য তিক্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত না হয়।

লেখক: খাদ্যপথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: এআই, পেকজেলসডটকম

Read full story at source