নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকলে ব্যবসা–বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়

· Prothom Alo

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্তি হয়েছে। তিন দশকে সংগঠনটির কাজ, দেশে বর্তমানে মার্কিন বিনিয়োগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিসহ ব্যবসা–বাণিজ্যের নানা বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন? এ দেশে বিনিয়োগে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের জায়গা কোনগুলো?

Visit grenadier.co.za for more information.

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ৬৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের। সেটা এখন বেড়ে ১ হাজার ৩৭০ কোটি ডলার হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের এই পথচলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বড় ও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এটাও সত্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির তুলনায় দেশটিতে আমাদের রপ্তানি অনেক বেশি। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল ইকোনমি, ক্লাউড অ্যান্ড সাইবার নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, ফার্মাসিউটিক্যাল, লাইফ সায়েন্স বা জীবনবিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বড় উৎপাদন (লার্জ ম্যানুফ্যাকচারিং), আর্থিক সেবা প্রভৃতি খাতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বেশি আগ্রহ রয়েছে।

মার্কিন কোম্পানিসহ অন্যদের এ দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা কোনগুলো?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশে এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম জ্বালানি আর অবকাঠামো। শুল্কের বিষয়টির অনেকটা সাময়িক সমাধান হয়েছে। তবে দুর্নীতিসহ প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। দুর্নীতি থাকলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে খুব বেশি আগ্রহ দেখান না। তাই যেভাবেই হোক দুর্নীতির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখা হবে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। সরকার এবারের বাজেটে ব্যক্তি করদাতা ও করপোরেট করের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের একটা পথনকশা দিয়েছে, যেটা আগে কখনো দেখা যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ডিরেগুলেশনের কথা বলা হচ্ছে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো বার্তা। যদিও ডিরেগুলেশনের বিষয়ে দৃশ্যমান খুব বেশি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

দেশে বর্তমানে গ্যাস-বিদ্যুতের যে সমস্যা চলছে, তাতে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে কতটা আগ্রহী হবেন বলে মনে করেন?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: সম্প্রতি সরকারের একাধিক মন্ত্রী বলেছেন, আগামী দুই বছরের আগে জ্বালানি নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। দুই বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথা শুনে বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন কোনো পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছেন না। সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দুই বছরের কথা বলা হয়েছিল। আবার সরকারের ছয় মাস পার হওয়ার পরও একই কথা বলা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীরা ধরে নিচ্ছে, আগামী দুই বছর আসলে বিনিয়োগ করে লাভ নেই, কেননা দেশে জ্বালানির সমস্যা থাকবে। জ্বালানি–সংকট মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট মাইলস্টোনসহ (মেয়াদি অর্জন) একটি স্পষ্ট পথনকশা প্রয়োজন। সরকার এটি প্রকাশ করলে বিনিয়োগকারীরা পুনরায় উৎসাহিত হবেন। তাঁরা জানতে পারবেন ঠিক কবে নাগাদ জ্বালানি পাওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী কারখানার নির্মাণকাজ ও বিনিয়োগের প্রস্তুতি শুরু করতে পারবেন।

অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিমধ্যে শুল্ক চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এ চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কী সুবিধা পাচ্ছে বা পাবে?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: আমরা যখন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা বলি, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে একটি আলোচনা বারবার সামনে আসে। এ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র কী পেল বা তারা কী অর্জন করবে, তা নিয়ে বেশি কথা আসছে। কিন্তু আমাদের মাথায় রাখতে হবে, এটি আমাদের জন্যও একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এ চুক্তির বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। তার মধ্যে বড় একটি দিক হলো, অন্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে যখন শুল্কের হার বেশি, সেখানে কম শুল্কের সুবিধা পাওয়া আমাদের জন্য একটি বড় সুরক্ষাবলয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমরা নিজেদের চাহিদা তুলে ধরতে পারি। বিশেষ করে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, বৃহৎ উৎপাদনশিল্প এবং লাইফ সায়েন্সের মতো সম্ভাবনাময় খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, তারা বিশ্বজুড়ে কাজ করে এবং তাদের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। ফলে শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে এসব নতুন খাতে মনোযোগ দিলে বড় অঙ্কের বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনা সম্ভব। অ্যামচেম থেকেও আমরা সব সময় চেষ্টা করছি কীভাবে নতুন কোম্পানি ও নতুন বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে পারি।

নতুন সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিরেগুলেশনের কথা বলছে। সরকারি সংস্থা বিডা, বেজা, পিপিপি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করা হয়েছে। এসব উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। বেপজাকে এই একীভূতকরণের বাইরে রাখা যুক্তিসংগত হয়েছে। কারণ, যেসব প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোয় অযাচিত কোনো হস্তক্ষেপ বা পরিবর্তন না করা ভালো। তবে হাইটেক পার্ককে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যেত। এই একীভূতকরণের ফলে বাস্তবে কতটুকু ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তা দেখার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের এ মুহূর্তে করণীয় কী বলে মনে করেন?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদের সক্ষমতার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রধানত তিনটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, বিশ্বমানের প্রযুক্তি, আধুনিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অংশীদারত্ব আরও বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট পথনকশার মাধ্যমে দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, এনবিআর ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নানা প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে হবে। সরকারের উচিত বেসরকারি খাতের দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব কাজে যুক্ত করা।

দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এসব খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে করণীয় কী?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতির ব্যাপ্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। দেশের যাবতীয় আর্থিক লেনদেনের প্রায় ৭২ শতাংশ এখনো নগদে হয়ে থাকে। সরকার ক্যাশলেস বা ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়াতে ‘বাংলা কিউআর’-এর মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে শুধু একটি নির্দিষ্ট মাধ্যম দিয়ে ক্যাশলেস সমাজ তৈরি করা সম্ভব নয়। কার্ড, এমএফএস এবং অন্য সব মাধ্যম নিয়ে একটি সমন্বিত ও সমান সুযোগভিত্তিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া সরকার ডিজিটাল লেনদেনে যে প্রণোদনার কথা বলছে, তা যেন আরও সুসংগঠিত হয়। ২ হাজার টাকার নিচের লেনদেনে মার্চেন্টদের চার্জ না নেওয়ার নীতি দীর্ঘ মেয়াদে পুরো ইকোসিস্টেমের গতিকে মন্থর করে দিতে পারে, কারণ এতে সেবাদাতাদের উৎসাহ থাকবে না। এ ছাড়া ডেটা সংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, ডিজিটাল পেমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো ক্ষেত্রগুলোয় বিশ্বজুড়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোর নেতৃত্ব রয়েছে। সাইবার স্পেসে ডেটা লিক বা তথ্য চুরি বাংলাদেশের নতুন একটি সমস্যা। এটি সরাসরি বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নিরাপত্তায় বিশ্বমানের প্রযুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ এসবের সুযোগ নিতে পারে। পাশাপাশি মেধাস্বত্বের সুরক্ষার ব্যাপারেও জোর দিতে হবে।

অ্যামচেমের ৩০ বছর পূর্ণ হলো। এই পথচলা কেমন ছিল?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: ১৯৯৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আমরা বাংলাদেশে কাজ শুরু করি। সেই যাত্রার ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে। অ্যামচেমের যাত্রার শুরুতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের কম। গত তিন দশকে তা বেড়ে ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আধুনিক সরঞ্জাম খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের আর্থিক খাত ও লজিস্টিকস ব্যবসায় অ্যামচেমের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অবদান রাখছে। এ ছাড়া এভিয়েশন, বৃহৎ উৎপাদনশিল্প, বিশেষায়িত মেডিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইমপ্ল্যান্টস এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের হোটেল চেইনগুলোর মাধ্যমে হসপিটালিটি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আধিক্য বেড়েছে। এসব ক্ষেত্রে অ্যামচেমের অবদান রয়েছে। ৩০ বছর ধরে সফলভাবে বাংলাদেশে ‘ইউএস ট্রেড শো’ আয়োজন করে আসছে অ্যামচেম। এটি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের ম্যাচমেকিং ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসারে সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

১৯৯৭-৯৮ সালে অ্যামচেম বাংলাদেশে প্রথম ‘বিজনেস অ্যাওয়ার্ড’ চালু করেছিল। অবশ্য ২০০৮ সালের পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এই পুরস্কার প্রদান কার্যক্রমটি শিগগিরই নতুন করে চালুর পরিকল্পনা করছি আমরা।

আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: গত ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগ এসেছে। এটি অনেক কম। আগামী সাড়ে চার বছরে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার নতুন মার্কিন বিনিয়োগ আনতে চাই আমরা। সেই পরিকল্পনা নিয়ে কাজও শুরু করেছি। আমি সরকারের প্রতি জ্বালানিনিরাপত্তা, একটি গ্রহণযোগ্য জ্বালানি পথনকশা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও নীতিনির্ধারণে অ্যামচেমের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানাই।

Read full story at source