জার্মানির রাজনীতিতে নব্য ডানপন্থী শক্তির উত্থানের পেছনে কী

· Prothom Alo

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তের পর ইউরোপের দেশে দেশে যে নিও লিবারেলদের বা উদারনৈতিক রাজনীতির স্রোত বহমান ছিল, আপাতত তাতে ভাটা পড়েছে।

ইউরোপ মহাদেশের উত্তরের দেশ নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, লিথুনিয়া, মধ্য ইউরোপে জার্মানি, পোল্যান্ড, হল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, আরও দক্ষিণে গ্রিস, ইতালি প্রভৃতি দেশের কোথাও এরা, কোথাও ক্ষমতাসীন বা কোয়ালিশন সরকারের সঙ্গে আর কোথাও কোথাও পার্লামেন্টে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকেরা যে সামাজিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন, সেই সামাজিক বাজার অর্থনীতি সেখানে নানা ধকল সামাল দিতে পেরেছে এবং এটা বিশ্বে একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। এখন তা অনেকটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।

বিগত সময়ে করোনা মহামারি, সাম্প্রতিক কালের ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায়ন, ইউক্রেন ও ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানিসংকট, মুদ্রাস্ফীতি আর সারা বছর ইউরোপ অভিমুখে শরণার্থীদের স্রোত কট্টরবাদী দলগুলোর আরও জনপ্রিয়তা অর্জনে সহায়ক হয়েছে।

জার্মানি কেন ‘আরেকটি ইসরায়েল’ হয়ে উঠছে

সর্বশেষ জার্মানির রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রশ্নটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয় নয়। জার্মান সরকারের ক্ষমতাসীন জোটের ভবিষ্যৎ, চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎসের রাজনৈতিক অবস্থান এবং সর্বোপরি জার্মানির গণতান্ত্রিক রাজনীতির দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্য—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যেন সেই প্রশ্নগুলোকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজ্য নির্বাচনে জার্মানির ডানপন্থী ও চরম বর্ণবাদী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি দলটির ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে। আবার এই সেপ্টেম্বর মাসের ২০ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য দুই রাজ্য-পার্লামেন্টে মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন ও বার্লিনের নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং দেশজুড়ে জনমত জরিপে এএফডি দলটির শক্ত অবস্থান—সব মিলিয়ে জার্মান রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্য-পার্লামেন্টে এএফডি দলটি প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে উঠে এসেছে। এটি শুধু একটি রাজ্য নির্বাচনের ফল নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির রাজনৈতিক ইতিহাসে এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বড়। একই সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক দল সেখানে মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোটে নেমে যাওয়ায় বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎসের নেতৃত্ব নিয়েও তাঁর নিজ দলের ভেতরে প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে।

অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি দলটির ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলত ইউরোপীয় মুদ্রা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির সমালোচক একটি দল হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান অনেক বেশি ডান দিকে সরে যায়। বিশেষ করে ২০১৫-১৬ সালের জার্মানিতে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর পর অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি এএফডি দলটির প্রধান রাজনৈতিক পুঁজি ও হাতিয়ারে পরিণত হয়।

জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের জয়, কী তাদের এজেন্ডা

আজ অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটির রাজনীতি শুধু অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জলবায়ুনীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জার্মানির নিরাপত্তা ও অভিবাসননীতি—প্রায় প্রতিটি বড় প্রশ্নেই দলটি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে।

এদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—দলটি মানুষের অসন্তোষকে রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পারছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আবাসন ব্যয় অনেক মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা নিয়ে সমাজে বিতর্ক রয়েছে। অর্থনীতির দুর্বলতা ও শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

জনগণের এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এএফডি দলটি একটি সরল রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। তারা বলছে ‘প্রচলিত দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে, আমরাই পরিবর্তন আনব।’ কোনো বিকল্প পরিকল্পনা বা ধারণা ছাড়াই এ ধরনের রাজনৈতিক ভাষা জটিল সমস্যার সহজ উত্তর দেয়। আর বর্তমানে নানা সংকটের মুহূর্তে এসব সহজ উত্তর মানুষের কাছে প্রায়ই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

২০২৫ সালের জার্মান পার্লামেন্ট বা বুন্দেশটাগ নির্বাচনে ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক দল বা সিডিইউ ও ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন বা সিএসইউ জার্মানির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সরকার গঠন করেছিল। ৬৩০ আসনবিশিষ্ট জার্মান পার্লামেন্ট বা বুন্দেশটাগে ক্ষমতাসীন জোটের আসনসংখ্যা ২০৮। আর সেই নির্বাচনে বর্ণবাদী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটি ১৫০টি আসন লাভ করে। ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি ৬৯টি আসন লাভ করেছিল। দলটি এখন জার্মান পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দল।

বিগত এক বছরে সরকার গঠনের পর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎসের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে—জনগণের প্রত্যাশা এবং সরকারের বাস্তব কর্মক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান।

চ্যান্সেলর হিসেবে মের্ৎস শক্তিশালী নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জার্মানির আন্তর্জাতিক ভূমিকা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার গঠনের পর অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, পেনশন, অভিবাসন এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে অসন্তোষ বেড়েই চলেছে।

সাম্প্রতিক জরিপে ক্ষমতাসীন জোট ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক দল বা ও ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়নের সমর্থন ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটি দেশজুড়ে জাতীয় পর্যায়ে তাদের পেছনে ফেলে ২৭ শতাংশ এগিয়ে আছে। আর সামাজিক গণতান্ত্রিক দল ও পরিবেশবাদী সবুজ দল যথাক্রমে ১২ ও ১৪ শতাংশ। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে সমস্যা এখন শুধু সরকারের জনপ্রিয়তা নয়, সমস্যাটি নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পরিণত হয়েছে।

যে দেশ দুটি বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে, সেই জার্মানিতেই নতুন করে নাৎসি আদর্শের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত নব্য ডানপন্থী শক্তি ও অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটির ক্রমবর্ধমান উত্থান দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

জার্মানির রাজনীতিবিষয়ক গবেষণায় বলা হচ্ছে, এখানে অন্তত তিন ধরনের ভোটারের কারণেই জার্মান রাজনীতিতে অস্থির অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রথমত, ভোটারদের একটি অংশ রয়েছেন, যাঁরা অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটির ডানপন্থা বর্ণবাদী আদর্শের সঙ্গে সত্যিই একমত। বিশেষ করে অভিবাসনবিরোধী, জাতীয়তাবাদী ও কঠোর আইনশৃঙ্খলা নীতির সমর্থক।

দ্বিতীয়ত, এমন ভোটার রয়েছেন, যাঁরা অন্য দলগুলোর ওপর হতাশ হয়ে প্রতিবাদী ভোট দিচ্ছেন। তৃতীয়ত, এমন ভোটারও রয়েছেন, যাঁরা মনে করেন ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক দল, সামাজিক গণতান্ত্রিক দল ও পরিবেশবাদী সবুজ দলের মতো প্রচলিত দলগুলো তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। এই তৃতীয় গোষ্ঠীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাজনৈতিকভাবে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই—তারা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি করে মানুষের অসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে ভোটে রূপান্তর করতে পারছে।

বার্লিন প্রাচীর পতনের ৩৫ বছর পর কী ভাবছেন জার্মানির মানুষ

যদিও শুধু সাবেক পূর্ব জার্মানির পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি রাজ্যে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটি বিশেষভাবে শক্তিশালী, তবে এই দলের উত্থান এখন পশ্চিমেও ছড়িয়েছে। তাই কেবল পূর্ব জার্মানির মানসিকতা বা পুরোনো পূর্ব জার্মানির রাজনৈতিক সংস্কৃতি দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোও দেখাচ্ছে যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বঞ্চনার অনুভূতির ক্ষোভ এই ভোটের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই মুহূর্তে চ্যান্সেলর মের্ৎসের সামনে দুটি রাজনৈতিক পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, তিনি নেতৃত্ব ধরে রেখে দ্রুত সরকারের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। যেমন অর্থনীতি, জ্বালানি, অভিবাসন, পেনশন, আমলাতন্ত্র ও জীবনযাত্রার ব্যয়—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সফলতা দেখিয়ে তিনি জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারেন। অথবা দ্বিতীয় পথ—পরপর কয়েকটি রাজ্য পার্লামেন্টের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়লে দলের ভেতর থেকেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে।

জার্মানির অভিবাসী সংগঠনগুলোর রাজ্য নেটওয়ার্ক (লামসা) ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সতর্কতা অবলম্বন এবং সুনির্দিষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। এএফডির নির্বাচনী বিজয় অভিবাসী সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। জার্মানির টাজ পত্রিকা জানিয়েছে, ১২ সেপ্টেম্বর জার্মানির ২৯টি শহরে অনুষ্ঠিত এএফডি দলটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নাৎসি অতীতের স্মৃতি আজও জার্মানির চরম ডানপন্থী রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বোঝা হয়ে রয়েছে। এই অতীতের দায় ও স্মৃতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে তারা নানা ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আনছে। অতীতকে সরাসরি অস্বীকার করা কঠিন বলে, তাদের একটি অংশ যুক্তি দেয়—নাৎসি অতীতকে ঘিরে অব্যাহত স্মরণ ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি নাকি জার্মানির স্বাভাবিক বিকাশ এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ‘ব্যবস্থা’ থেকে বেরিয়ে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে দেশ দুটি বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে, সেই জার্মানিতেই নতুন করে নাৎসি আদর্শের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত নব্য ডানপন্থী শক্তি ও অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দলটির ক্রমবর্ধমান উত্থান দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

  • সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মান প্রতিনিধি

[email protected]

Read full story at source