গ্রিনল্যান্ডবাসীরা ট্রাম্পের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে চেয়েছিলেন। এরপর তিনি বলপ্রয়োগ করে তা দখলের হুমকি দেন। গত শুক্রবার তিনি ঘোষণা করেন যে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে একটি মেয়াদহীন চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ড হচ্ছে সুমেরু অঞ্চলের একটি বিশাল দ্বীপ ও ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যা বহু বছর ধরে ট্রাম্পের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

গত শনিবার গ্রিনল্যান্ডজুড়ে এই চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশটির কিছু বাসিন্দা স্বস্তি প্রকাশ করেন। তবে একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে বিভ্রান্তি, উদ্বেগ এবং একটি প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তাঁদের প্রশ্নটি হচ্ছে, ঠিক কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে?

দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নারসাক শহরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এলেন ফ্রেডরিকসেন বলেন, ‘আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, এটি আমাকে উদ্বিগ্ন ও সংশয়ী করে তুলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প যেভাবে এটি উপস্থাপন করছেন, তাতে মনে হচ্ছে তাঁকে যেন গ্রিনল্যান্ডের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বা একচেটিয়া অধিকার দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, বিষয়টি যেন তেমন না হয়।’

গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন তাঁর ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন, তখন থেকে সৃষ্ট সংকট নিরসনের উপায় খোঁজার দায়িত্ব ট্রাম্পের সহযোগীদের ওপর ছিল। গত শুক্রবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, নতুন এই চুক্তির ফলে দ্বীপটিতে মার্কিন সামরিক বা নিরাপত্তা উপস্থিতি আরও বাড়বে। তবে চুক্তির বিস্তারিত বিষয়াবলি আগামী সপ্তাহের আগে প্রকাশ করা হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ‘নিরাপত্তা ও অন্যান্য সব প্রয়োজনের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ নিশ্চিত করেছে। তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের কর্মকর্তারা এই চুক্তির ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে অনেকটাই সংযত মন্তব্য করেছেন এবং তাঁরা এ বিষয়ে খুব কমই মুখ খুলেছেন।

শনিবার ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স রাসমুসেন বলেন, এই চুক্তি ‘দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান’ ঘটাতে পারে এবং ‘আগামী সপ্তাহটি একটি ভালো সপ্তাহ হতে পারে’।

কিছু বিশ্লেষক ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ট্রাম্প হয়তো এই চুক্তির গুরুত্ব বাড়িয়ে বলছেন। ১৯৫০-এর দশকের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপক প্রবেশাধিকার ভোগ করে থাকে। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের জনগণ কখনোই এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। আর গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা আগেই জানিয়েছিলেন যে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী।

কোপেনহেগেনের ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মিকেল রুংগে ওলেসেন বলেন, ‘অধিকারের দিক থেকে বিবেচনা করলে, মূল চুক্তির অধীনেই তারা ইতিমধ্যেই অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছিল।’

শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, নতুন চুক্তি রাশিয়া ও চীনকে গ্রিনল্যান্ডে কখনোই সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দেবে না। তবে ওলেসেন মনে করিয়ে দেন, গ্রিনল্যান্ড যেহেতু ন্যাটোর আওতাভুক্ত একটি অঞ্চল, তাই চীন বা রাশিয়া সেখানে সেনা পাঠাবে—এমন কোনো বাস্তব সম্ভাবনা কখনোই ছিল না।

ওলেসেন প্রশ্ন তোলেন, ‘এই সংকট তৈরি না করেও কি এগুলো অর্জন করা সম্ভব ছিল না?’

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন

গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর একটি দেড় বছর। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ট্রাম্প যখন দ্বীপটি দখলের হুমকি দেন, তারপর থেকেই তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন হুমকি ও সতর্কবার্তা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

অনেকেই সংবাদের পেছনে ছুটতে শুরু করেন, ওয়াশিংটন থেকে কোনো বার্তা এল কি না, তা জানতে সব সময় শিরোনামের দিকে চোখ রাখতেন। কেউ কেউ বলেন, পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেই চিন্তায় রাতে ঘুমাতেও তাঁদের কষ্ট হতো।

রাজধানী নুকের চলচ্চিত্রনির্মাতা ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য আকাক হানসেন বলেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে তাঁকে চরম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। মার্কিন আক্রমণ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি পাঁচ দিনের খাবার–পানি মজুত করে রেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এখন হঠাৎ করে সব ঠিক হয়ে গেল! এর মধ্যে আসলে কী ঘটল?’

গ্রিনল্যান্ড

গ্রিনল্যান্ডের মানুষের কাছে এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি, যেখানে সার্বভৌমত্ব ও বহিরাগত প্রভাবের বিষয়গুলো কখনোই নিছক তাত্ত্বিক ছিল না। আয়তনে দ্বীপটি মেক্সিকোর চেয়ে বড় হলেও এর জনসংখ্যা ৬০ হাজারের কম।

৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে এটি ডেনমার্কের রাজতন্ত্রের অংশ এবং বর্তমানে অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসী মিশ্র জীবনধারায় অভ্যস্ত—যার কিছুটা স্ক্যান্ডিনেভীয় এবং কিছুটা দেশীয় ইনুইট সংস্কৃতি। উদাহরণস্বরূপ, এখনো অনেক মানুষ সিল শিকার করেন।

তুষারাবৃত প্রান্তর, নাটকীয় ফিয়র্ড, আইসবার্গ ও বরফের পাহাড় পরিবেষ্টিত দ্বীপটির বড় একটি অংশ অপরূপ সুন্দর। পরিবেশ রক্ষা করা সব সময়ই তাঁদের অগ্রাধিকারের শীর্ষে ছিল। আর এ কারণেই কিছু গ্রিনল্যান্ডবাসী জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ব্যাপারে ট্রাম্পের কথাবার্তায় তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না।

ইতিমধ্যেই পেন্টাগন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। চলতি সপ্তাহেই মার্কিন সৈন্যদের দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নারসারসুয়াক শহরের একটি এয়ারস্ট্রিপ বা বিমান উড্ডয়নক্ষেত্র পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।

নুকে বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা আনা উলাট বাখ বলেন, ‘তাদের যদি আমাদের আশপাশে এভাবে বিমান নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়, তবে তা হবে পুরোপুরি এক পরিবর্তন। আমরা সৈনিক নই। আমরা প্রকৃতির মানুষ এবং আমরা এটি রক্ষা করতে চাই।’

তবু কিছু মানুষ আশাবাদী ছিলেন। ডেনমার্কের পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডের দুজন প্রতিনিধির একজন নাজা নাথানিয়েলসেন বলেন, ‘চুক্তিটি যদি চূড়ান্ত হয়, তবে এটি স্বাভাবিক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব পরিবেশ তৈরি করবে। এটি একটি ভালো বিষয় হবে, এ নিয়ে খুব বেশি দ্বিমত থাকার কথা নয়।’

Read full story at source