ট্রাম্পের কাছে আসলে কী চান সি চিন পিং

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশের নেতা হিসেবে তাঁদের বৈঠকের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পড়বে। তবে ট্রাম্প যদি মনে করেন, চীনের পররাষ্ট্রনীতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়, তাহলে তিনি ভুল করবেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

সি চিন পিং একই সঙ্গে কঠোর শাসক ও আদর্শবাদী নেতা। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি ‘সি চিন পিং চিন্তাধারা’। এর কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর নিজের নেতৃত্ব ও কমিউনিস্ট পার্টির শাসন টিকিয়ে রাখা। এরপরই রয়েছে বিশ্বে চীনের মর্যাদা ও প্রভাব বাড়ানো। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের বিরুদ্ধে চীনের কঠোর অবস্থানও এই অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে চীনের নতিস্বীকার করা কঠিন।

সি চিন পিংয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তাঁর কথিত ‘জাতীয় পুনর্জাগরণের চীনা স্বপ্ন’ ২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা। এ লক্ষ্য অর্জনে চীন দুটি বড় পথে এগোচ্ছে। প্রথমত, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কাছ থেকে চীনের পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে ব্যাপক সমর্থন আদায় করা।

ট্রাম্প-সি চিন পিং বৈঠকে আলোচনায় কেন ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’পুতিন ও সি চিন পিং, যেখানে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না

করোনা মহামারির পর সি বিদেশ সফর কমিয়ে দিলেও বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন, মিসর ও ভারত সফর থেকে বোঝা যায়, এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন।

দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করা। প্রশান্ত মহাসাগরের প্রথম দ্বীপশ্রেণিতে তাইওয়ানের কৌশলগত অবস্থান এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের কারণে তাইওয়ান দখল করতে পারলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ হবে। তবে এমন অভিযান শুরুর আগে চীনকে সফলতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। ২০৫০ সালের সময়সীমা থেকে বোঝা যায়, এ বিষয়ে সি চিন পিং এখনই তাড়াহুড়ো করছেন না।

বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে কাছে টেনে চীন তার নেতৃত্বে ‘মানবজাতির অভিন্ন নিয়তি’ গড়ে তুলতে চায়। সি চিন পিং একে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতন্ত্রীকরণ’ হিসেবে তুলে ধরেন। এর লক্ষ্য বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে চীনকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।

২০১৯ সালে ওসাকায় দ্বিপক্ষীয় সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিং

সি চিন পিংয়ের দৃষ্টিতে বর্তমান উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি ও নিয়ন্ত্রিত। জাতিসংঘের সদস্যদেশ ও বিশ্বের জনসংখ্যার তুলনায় পশ্চিমা দেশগুলো সংখ্যালঘু। বিপরীতে বৈশ্বিক দক্ষিণে অধিকাংশ দেশ ও মানুষ রয়েছে। চীন নিজেকেও এই বৈশ্বিক দক্ষিণের অংশ মনে করে। জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক দক্ষিণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে চীন বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশেই গণতন্ত্রের চেয়ে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বেশি। এসব দেশের নেতাদের কাছে চীনের মডেল আকর্ষণীয় হতে পারে। কারণ, বেইজিং তাদের নিজেদের মতো করে দেশ পরিচালনার অধিকারকে সমর্থন করে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভও তাদের জন্য প্রণোদনা। এর মাধ্যমে পশ্চিমা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তুলনায় কম জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার শর্তে উন্নয়ন ঋণ পাওয়া যায়।

তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক পরিচালনার জন্য বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতি সি চিন পিংয়ের আগ্রহ ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা বোঝা জরুরি। চীনের লক্ষ্য শুধু আমেরিকান আধিপত্যের অবসান নয়; উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য গণতন্ত্রই সবচেয়ে ভালো পথ—এই ধারণাকেও দুর্বল করা।

পুতিন-সি চিন পিং পশ্চিমা চাপকে যেভাবে বুড়ো আঙুল দেখালেন

ইরান যুদ্ধ এর একটি উদাহরণ। চীন চায়নি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাক। কিন্তু সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও যুক্তরাষ্ট্র নিজের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় চীন এখন লাভবান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করবে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্ষতি করবে, চীনের পক্ষে সমর্থন আদায় তত সহজ হবে।

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে সি চিন পিংয়ের প্রধান অগ্রাধিকার হবে বৈঠকটিকে বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা। এরপর থাকবে একটি বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে তার নিজের তৈরি সংকট থেকে বের হতে সাহায্য করা তাঁর আলোচ্যসূচিতে থাকার সম্ভাবনা কম। বরং ট্রাম্পের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা, বৈঠকের ভালো চিত্র তৈরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সুবিধা নেওয়াই সি চিন পিংয়ের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • স্টিভ সাং লন্ডনের সোয়াস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

Read full story at source