ওরহান গাজী: ওসমানীয় সাম্রাজ্যের মহাদিগন্ত সূচনায় ঐতিহাসিক নাম—পর্ব ১

· Prothom Alo

ওরহান গাজী হচ্ছে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সূচনায় এক মহা অধ্যায়। তাঁর বিজয়গাথা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের শুধু পরিধিই বাড়ায়নি, বরং ভিত মজবুত করেছে একটি নতুন গঠিত সাম্রাজ্যের। বাবা ওসমান গাজীর গড়ে তোলা স্বাধীন ক্ষুদ্র ওসমানীয় রাষ্ট্রকে তিনি সম্প্রসারণ করে স্থিতিশীলতা দিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাম্রাজ্যের ভিত্তি। তাই ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসে ওরহান গাজীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

Visit newsbetting.club for more information.

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, ওরহান গাজীকে নিয়ে নির্মিত ‘সুলতান ওরহান’ তুর্কি সিরিজে স্বয়ং ওরহান গাজীর ইতিহাস বিকৃতি নজরে এসেছে অনেক দর্শকের। বলা বাহুল্য, দিরিলিস আরতুগ্রুল এবং কুরুলুস ওসমানের মতো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় দুটি সিরিজ প্রায় এক যুগ ধরে সফলভাবেই পরিচালনা করেছিল তুর্কি নির্মাতা মেহমেত বোজদাগের প্রোডাকশন। সেই একই বোজদাগ প্রোডাকশন আরতুগ্রুল ও ওসমানের পর ক্রমান্বয়ে ওরহানকে নিয়ে সিরিজ পরিচালনার পরিকল্পনা করে গত বছর।

ফলে প্রায় ১ বছর ধরে সুলতান ওরহান সিরিজের ২৬টি এপিসোড রিলিজ হয়। ওই সিরিজ প্রথম দিকে কিছুটা জনপ্রিয়তা পেলেও পরে মাঝের দিকের এপিসোডগুলো থেকেই জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে। টিআরপি রেট নিম্নমুখী হওয়া এবং কয়েক সপ্তাহে একই নিম্ন রেটে অবস্থান করাটা ওই সিরিজের শেষ ডেকে আনে। পরে ২৬তম এপিসোড দিয়ে সিরিজকে শেষ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। আরতুগ্রুল ও ওসমানের জীবনীর আলোকে বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি সিরিজ বিশ্বব্যাপী বাজিমাত করলেও ওরহানের জীবনীর আলোকে নির্মিত সিরিজ ফ্লপ হয়ে প্রথম সিজনেই বিদায় নেয়। এ জন্য অধিকাংশ দর্শকের দাবি, সুলতান ওরহান সিরিজের স্ক্রিপ্ট কিছুটা কাল্পনিক ও বিরক্তিকর ছিল।

ওরহানের জীবনের প্রকৃত ইতিহাসের অংশবিশেষ ফুটে উঠলেও ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে অনেক বেশি। তা ছাড়া বেশ কিছু কাল্পনিক চরিত্রের আগমন ঘটেছে বলে সিরিজের বিভিন্ন প্লট বেশ বিরক্তিকর মনে হয়েছে অনেক দর্শকের কাছে। যদিও আরতুগ্রুল এবং ওসমানের সিরিজেও একেবারে পরিপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা হয়নি, তারপরও সিরিজ দুটির স্ক্রিপ্ট ও প্লটগুলো দর্শকদের অনায়াসে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। তবে ওরহানের ক্ষেত্রে কয়েকটি ঐতিহাসিক চরিত্রের অভাব, কাল্পনিক চরিত্রগুলোর দৌরাত্ম্য এবং ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্ক্রিপ্ট না তৈরি করতে পারাটাই সিরিজটির ব্যর্থতার মূল কারণ বলা যায়। তবে একটি কথা বলতেই হয়, সিনেমা বা সিরিজ পরিচালকেরা দর্শকদের আকৃষ্ট করতেই বেশ মনোরঞ্জক স্ক্রিপ্ট ও বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপট আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলেন। সে জন্য ইতিহাসের বিকৃতিও ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

যা–ই হোক, সিরিজের মাধ্যমে ওরহান গাজীর ইতিহাস আপনারা সেভাবে না জানতে পারলেও আপনাদের তার প্রকৃত ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। তাই আপনাদের কাছে ওরহান গাজীর প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছি। লেখক হিসেবে চেষ্টার কমতিও রাখছি না ওরহান গাজীর ইতিহাস তুলে ধরতে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ধরে ও অধিকাংশ তথ্য সংগঠিত করেই ওরহানের ইতিহাস তুলে ধরা হবে। উল্লেখ্য, ওরহানের শাসনামলে বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনার পরিপূর্ণ ব্যাখ্যায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের সমসাময়িক ইতিহাসও বর্ণিত হবে। আশা করি, আপনারা উপভোগ করবেন ও উৎসাহ দিয়ে পাশে থাকবেন।

ওরহান গাজী ১২৭৯ সালে মতান্তরে ১২৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ওসমান গাজীর প্রথম সন্তান। তাঁর মা ছিলেন ওসমান গাজীর প্রথম স্ত্রী মালহুন হাতুন। ছোটবেলা থেকেই ওরহান ছিলেন বেশ সাহসী ও বুদ্ধিমান। তিনি কৈশোর বয়স থেকেই তির নিক্ষেপ, তলোয়ার চালানো ও শিকারে বেশ শক্তিশালী হতে থাকেন। বাবা ওসমান গাজীর ছত্রচ্ছায়ায় ওরহান ধীরে ধীরে নিজেকে একজন শক্তিশালী বে হিসেবে গড়ে তুলছিলেন। তৎকালীন সময়ে অনেকেই ওরহানের মধ্যে তার বাবার আদর্শ দেখতে পেত। ওরহান যুবক বয়স থেকেই তার বাবার সঙ্গে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিতে থাকে। ওরহানের বীরত্বগাথা ঐতিহাসিকভাবে প্রথম প্রকাশ পায় ১৩০৩ সালে ডিম্বোসের প্রান্তরে রোমান সৈন্যদের বিরুদ্ধে ওসমানীয়দের যুদ্ধে। এ যুদ্ধে প্রবল সাহসিকতার পরিচয় দেন ওরহান, যা তার বাবা ওসমানকেও মুগ্ধ করেছিল। ওই যুদ্ধে ওসমানীয়দের কষ্টার্জিত বিজয়ে নিজের বীরত্বের জানান দিয়ে ওরহান হয়েছিলেন বেশ প্রশংসনীয়। এরপর থেকে ওসমান বে ওরহানকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলতে অভিজ্ঞতার জন্য নিজের জয় করা বিভিন্ন দুর্গ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যদিও ওরহান সাময়িক বা অস্থায়ী গভর্নর হিসেবে বিভিন্ন দুর্গ পরিচালনা করেছিলেন, তবু তিনি যুবক বয়স থেকেই বেশ দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তা ছাড়া কয়েকটি অভিযানে ওরহান কমান্ডারের ভূমিকা পালন করে বারবার নিজের বীরত্ব জানান দিয়েছিলেন।

ওরহান যুবক বয়স থেকেই তাঁর বাবার সঙ্গে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিতে থাকেন

ওসমান বে বুরসা অভিযান শুরু করার আগপর্যন্ত ওরহান এসকিসেহির শহরে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ওসমান বে বুরসা অভিযান শুরু করে টানা তিন বছর অবরোধ ও কিছু খণ্ড যুদ্ধের পর ১৩২০ সালে ওরহানের কাছে অভিযানের দায়িত্ব দিয়ে রাজধানী ইয়েনিসেহিরে চলে যান। ওরহান গাজী পরে টানা ছয় বছর তুমুল অবরোধ, কয়েকটি ছোট দুর্গ জয় ও সফলতার সঙ্গে কিছু খণ্ডযুদ্ধ পরিচালনা করে বুরসাকে রোমান সাম্রাজ্য থেকে একদম বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। অবশেষে ১৩২৬ সালের ৬ এপ্রিলে বুরসার গভর্নর ও রোমান সৈন্যরা ওরহানের নেতৃত্বে থাকা ওসমানীয় সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণ করে বুরসার দরজা খুলে দেয়। বুরসা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে ওসমান বে বুরসায় প্রবেশ করে নিজের দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ায় খুব আনন্দিত হন। তিনি নিজের পুত্র ওরহানের এমন সফলতায় বেশ গর্ববোধ করেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন, তার প্রতিষ্ঠা করা নতুন সাম্রাজ্য পরিচালনায় ওরহানই তার যোগ্য উত্তরসূরি হবেন। পরে বুরসা বিজয়ের তিন মাস পর ওসমান বে ইন্তেকাল করেছিলেন। তবে তিনি মৃত্যুর আগে অসিয়ত করেছিলেন যে ওরহানকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসাতে। যদিও ওসমানের আরেক পুত্র আলাউদ্দিন বে-ও ছিলেন সিংহাসনে ওরহানের প্রতিদ্বন্দ্বী। চলবে...

* তাওহীদ জানান অভিক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source