রাঙ্গুনিয়ায় ১৭ কোটি টাকার কেব্‌ল কার দুই বছর ধরে ধ্বংসস্তূপ

· Prothom Alo

পার্কে ঢুকতেই হাতের ডানে কেব্‌ল কারের প্রথম স্টেশন। একসময় এখানকার টিকিট কাউন্টারে ভিড় করতেন দর্শনার্থীরা। অভ্যর্থনাকক্ষ পেরিয়ে কেবিনে উঠতেন তাঁরা। তারপর পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতেন অন্য প্রান্তে।

এখন সেই স্টেশনজুড়ে ভাঙচুরের চিহ্ন। অভ্যর্থনাকক্ষ, টিকিট কাউন্টার, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, শৌচাগার ও জেনারেটর কক্ষ—সবই ভাঙাচোরা। পড়ে আছে সাতটি কেবিন। সব কটির কাচ ভাঙা। ভেতরের যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই নেই।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

এ চিত্র চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের। পার্কটির প্রধান আকর্ষণ এই কেব্‌ল কার নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সরকারি কেব্‌ল কার হিসেবে পরিচিত ছিল এটি। ২০২৪ সালের আগস্টে ভাঙচুর ও লুটপাটের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মেরামতের কাজ শুরু হয়নি। অর্থ বরাদ্দও পায়নি বন বিভাগ।

১৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, প্রথম স্টেশনের কক্ষগুলো ফাঁকা। ভেতরে ভাঙা কাচ, আবর্জনা ও লোহার বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পড়ে আছে লোহার ভারী কিছু যন্ত্র। সেগুলোর বিভিন্ন অংশও ভাঙা।

এখন সেই স্টেশনজুড়ে ভাঙচুরের চিহ্ন। অভ্যর্থনাকক্ষ, টিকিট কাউন্টার, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, শৌচাগার ও জেনারেটর কক্ষ—সবই ভাঙাচোরা। পড়ে আছে সাতটি কেবিন। সব কটির কাচ ভাঙা। ভেতরের যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই নেই।
একসময় দর্শনার্থীরা এসে এই কক্ষে অপেক্ষা করতেন। এরপর এখান থেকে কেব্‌ল কারে চড়তেন। কক্ষটি এখন এভাবে পড়ে আছে

প্রথম স্টেশন থেকে পাহাড়ি পথে প্রায় আড়াই কিলোমিটার হেঁটে বেলা একটার দিকে দ্বিতীয় স্টেশনে পৌঁছালে দেখা যায় একই চিত্র। পাশে পড়ে আছে আরও পাঁচটি ভাঙা কেবিন। নিয়ন্ত্রণকক্ষের ভেতরে দুটি ভারী যন্ত্র পড়ে আছে। তবে সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী নয়।

পার্কের কর্মচারীরা জানান, কেবিন ও ভারী যন্ত্রপাতি ওজনের কারণে লুটপাটকারীরা নিয়ে যেতে পারেনি। সেগুলো ভাঙচুর করে ফেলে রাখা হয়। তাঁদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৭ আগস্ট টানা তিন দিন পার্কে ভাঙচুর ও লুটপাট চলে। ট্রাকে করে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়।

যাওয়া-আসা মিলিয়ে কেব্‌ল কারটির যাত্রাপথ প্রায় ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার। কোনো কোনো জায়গায় মাটি থেকে প্রায় ১০০ ফুট ওপর দিয়ে চলত কেব্‌ল কারটি। ওপর থেকে দেখা যেত পাহাড়, বন আর জলাধার।

মিহির কুমার দো, বন সংরক্ষক, চট্টগ্রাম অঞ্চলএটি মেরামত অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করতে প্রথমে বিদেশ থেকে অভিজ্ঞ কারিগরি দল আনতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হবে।

কেব্‌ল কার হলো তারের সাহায্যে ভূমি থেকে উঁচুতে চলাচল করা বিশেষ ধরনের যান। শক্তিশালী তারের সঙ্গে ঝুলন্ত কেবিন এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে চলাচল করে। পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবেও কেব্‌ল কার ব্যবহৃত হয়।

কেব্‌ল কার এখন ধ্বংসস্তূপ

সরকারি পর্যটনকেন্দ্রে দেশের প্রথম কেব্‌ল কার চালু হয়েছিল বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে। ২০১০ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া ওই কেব্‌ল কারের যাওয়া-আসার পথ প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট বা ৪৮৮ মিটার। সেই হিসাবে রাঙ্গুনিয়ার কেব্‌ল কারের যাত্রাপথ মেঘলার প্রায় পাঁচ গুণ।

কেব্‌ল কারের শেষ স্টেশনে নেমে এই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে পুরো পার্কটি ঘুরে দেখতে পারতেন দর্শনার্থীরা

কেব্‌ল কারটি কেন মেরামত করা হচ্ছে না, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো প্রথম আলোকে বলেন, এটি মেরামত অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করতে প্রথমে বিদেশ থেকে অভিজ্ঞ কারিগরি দল আনতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হবে; কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সেই প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কেব্‌ল কারে। প্রথম বা লোয়ার স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের ক্ষতি ধরা হয় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। মোটর, ব্রেক, সার্কিট বোর্ডসহ বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক বিভিন্ন সরঞ্জাম ধ্বংস ও লুট হয়।

দুই স্টেশনেই ক্ষতি ৩ কোটি

একেকটি কেবিনের চারপাশ কাচ দিয়ে ঢাকা ছিল। দর্শনার্থীরা এতে বসে ওপর থেকে পাহাড়, বন ও জলাধারের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারতেন

ভাঙচুরের পর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করে বন বিভাগ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন শেখ রাসেল এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এতে অফিস, স্টোররুম, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পাখির আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কেব্‌ল কারে। প্রথম বা লোয়ার স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের ক্ষতি ধরা হয় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। মোটর, ব্রেক, সার্কিট বোর্ডসহ বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক বিভিন্ন সরঞ্জাম ধ্বংস ও লুট হয়।

দ্বিতীয় বা আপার স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষে ক্ষতি হয় আরও ১ কোটি ২০ লাখ টাকার। অর্থাৎ কেব্‌ল কারের দুই স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাতেই ক্ষতি হয় প্রায় ৩ কোটি টাকার। পুরো পার্কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ৫ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথম পর্যায়ে ৪০ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে পার্কটি গড়ে তোলা হয়। ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। দেশি-বিদেশি পাখির আবাসস্থল, খাঁচা ও জলাধারের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।

দুই ধাপে গড়ে ওঠে পার্ক

চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের দক্ষিণ নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পার্কটির অবস্থান। আয়তন প্রায় ২১০ হেক্টর বা ৫২০ একর।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথম পর্যায়ে ৪০ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে পার্কটি গড়ে তোলা হয়। ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। দেশি-বিদেশি পাখির আবাসস্থল, খাঁচা ও জলাধারের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।

এই প্রকল্পের অন্যতম বড় স্থাপনা ছিল কেব্‌ল কার। এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১২ সালে। ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠান কেব্‌ল কারটি স্থাপন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীদের কাছ থেকে এটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নেন স্থানীয় কারিগরি কর্মীরা।

সর্বোচ্চ ২০টি কেবিন চালানোর উপযোগী করে তৈরি করা হলেও কেবিন ছিল ১২টি। প্রতিটিতে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রী উঠতে পারতেন।

কেব্‌ল কার দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মোহাম্মদ সাঈদ সাকলাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সরকারি কেব্‌ল কার ছিল; আর কোনো সরকারি পার্কে এত দীর্ঘ কেব্‌ল কার নেই। সর্বোচ্চ ২০টি কেবিন চালানোর সক্ষমতা রেখে এটি তৈরি করা হয়েছিল।

পরে আবার দর্শনার্থীদের জন্য চালু হয় কেব্‌ল কারটি; কিন্তু ২০২১ সালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর পর মেরামত করে ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়। সেই দফায় সচল ছিল প্রায় ১১ মাস। ২০২৪ সালের আগস্টের ভাঙচুর ও লুটপাটের পর আবার বন্ধ হয়ে যায়।

পার্কসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, কেব্‌ল কার সচল থাকার সময় দিনে সাধারণত ৪০০ থেকে ৭০০ দর্শনার্থী চড়তেন। উৎসব ও ছুটির দিনে সেই সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেত। প্রাপ্তবয়স্কদের যাওয়া-আসার টিকিট ছিল ২৩০ টাকা। ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ছিল ১১৫ টাকা।

তবে উদ্বোধনের পর বেশি দিন সচল থাকেনি কেব্‌ল কারটি। চালুর মাত্র দুই মাসের মাথায় দ্বিতীয় বা আপার স্টেশনের একটি পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে যায়। ঝুঁকির কারণে তখন পর্যটকদের জন্য এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পিলারটি সুরক্ষিত করতে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকলেও যন্ত্রপাতি ও কেবিন সচল রাখতে সপ্তাহে দুই দিন পরীক্ষামূলকভাবে কেব্‌ল কার চালানো হতো বলে সে সময় প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী।

পরে আবার দর্শনার্থীদের জন্য চালু হয় কেব্‌ল কারটি; কিন্তু ২০২১ সালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর পর মেরামত করে ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়। সেই দফায় সচল ছিল প্রায় ১১ মাস। ২০২৪ সালের আগস্টের ভাঙচুর ও লুটপাটের পর আবার বন্ধ হয়ে যায়।

রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরীঅতীতে পার্কের কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে এখন সব কাজ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হবে। পার্কটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রধান আকর্ষণ কেব্‌ল কারটিও সংস্কার করা হবে।

পার্কটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল জব্বার বলেন, কেব্‌ল কার চালু থাকলে পার্কে দর্শনার্থীর সমাগম বেড়ে যায়। এটি বন্ধ থাকায় পার্কের আকর্ষণও কমেছে।

এর মধ্যে পার্কটি আরও সম্প্রসারণে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প নেয় বন বিভাগ। ২০১৮ সালে ১২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পটি অনুমোদন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর আওতায় পাখির আবাসস্থল, পর্যটকদের বসার শেড, হ্রদ ঘিরে অবকাঠামো, নিরাপত্তাচৌকি, পানি সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেব্‌ল কারের পথ বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল। তবে পরে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে বন বিভাগ।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে অচল কেব্‌ল কারটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে পার্কের কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে এখন সব কাজ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হবে। পার্কটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রধান আকর্ষণ কেব্‌ল কারটিও সংস্কার করা হবে।

Read full story at source