মৃত্যুর মুখেও আলতাফ মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশ অবশ্যই স্বাধীন হবে’
· Prothom Alo

আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে বন্দী হয়ে বেঁচে ফেরা সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণায় উঠে এল তাঁর শেষ দিনগুলোর কথা।
Visit rouesnews.click for more information.
‘আলতাফ মাহমুদ নিশ্চিত জানতেন তাঁকে হত্যা করা হবে। হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ছাড়বে না। তবু তিনি মনোবল অটুট রেখেছিলেন। একটুও সাহস হারাননি। তাঁর কপাল থেকে অনেকখানি চামড়া কেটে ঝুলে পড়েছিল বেয়োনেটের আঘাতে। রাইফেলের বাঁটের আঘাতে মুখের এক পাশ ভয়ানক জখম হয়েছিল। একটা চোখ বুজে গিয়েছিল। সারা শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন। ঠিকমতো বসেও থাকতে পারতেন না। আমার কাঁধে মাথা রেখে বলেছিলেন, “আমাকে ওরা ছাড়বে না। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমাদের দেশ অবশ্যই স্বাধীন হবে।” আমাদের তিনি সাহস না হারাতে বলতেন।’
শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের শেষ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এই বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর সঙ্গে বন্দিশালায় থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল আলম বিল্লাহ ওরফে খনু বিল্লাহ। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ছায়ানট মিলনায়তনে স্মৃতি ৭১ আয়োজিত ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধ এবং তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধার বিস্ময়করভাবে বেঁচে ফেরার গল্প’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে খায়রুল আলম বিল্লাহ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আলতাফ মাহমুদের শেষ দিনগুলো ও তাঁদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের বিবরণ দর্শকদের কাছে তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে আরও স্মৃতিচারণা করেন আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে একই দিনে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে আটক শিল্পী আবুল বার্ক্ আলভী, ব্যাংকার নাসের বখতিয়ার ও সংগীতশিল্পী লিনু বিল্লাহ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁরা দেশের অভ্যন্তরে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁরা নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁরা অনেকটা উপেক্ষিত থেকেছেন। মনে রাখা দরকার, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। দেশের অভ্যন্তরে থেকে যাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছিলেন, তাঁদের সেই সহযোগিতা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা উপলব্ধি করা দরকার। এই যুদ্ধে রাজনৈতিক নেতাদের যেমন ভূমিকা ছিল, তেমনি সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও ভূমিকা ছিল। শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদ কাজ করেছেন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখাসহ নানা রকম সহায়তা করেছেন। এই অনুষ্ঠানে তাঁকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে শহীদসহ সব মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী, শরণার্থীসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাইকে সশ্রদ্ধ স্মরণ করছি।’
আয়োজকদের পক্ষে ফারুক এইচ খান জানান, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনা, ব্যক্তিত্বের অবদান, অজানা বিষয় তুলে ধরে ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেছেন। এর আগে অপারেশন জ্যাকপট, যশোর রোড ও অন্যান্য বিষয়ে অনুষ্ঠান করেছেন। এবার শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের অবদান তুলে ধরে অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁদের এমন ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রথমেই সুরকার আলতাফ মাহমুদ ও তাঁর সঙ্গীদের আটকের ঘটনা নিয়ে হৃদয়ে একাত্তর নামে একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। এটি নির্মাণ করেছেন অভিনয়শিল্পী আফজাল হোসেন। এরপর আলতাফ মাহমুদ ও তাঁর সহযোদ্ধাদের নির্যাতন নিয়ে বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে একটি নাটক পরিবেশন করা হয়। এই নাটক রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন রুশো রকিব।
চার বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণা
এরপর মঞ্চে আসেন আলতাফ মাহমুদের সহযোদ্ধাদের মধ্যে জীবিত ফিরে আসা চার বীর মুক্তিযোদ্ধা।তাঁদের উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানানো হয়। এরপর ছিল তাঁদের স্মৃতিচারণা। এই পর্ব সঞ্চালনা করেন মাহবুব জামান।
শিল্পী অধ্যাপক আবুল বার্ক্ আলভী বলেন, তিনি রণাঙ্গন থেকে ঢাকায় এসে আলতাফ মাহমুদের বাসায় গিয়েছিলেন দেখা করতে। রাত হয়ে যাওয়ায় আলতাফ মাহমুদ তাঁকে থেকে যেতে বলেন। পরদিন সকালে পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি ঘেরাও করে আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে তাঁকেও আটক করে। অন্যদের মতো তাঁকেও প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়েছিল। তিনি ছবি আঁকেন জেনে হানাদারেরা তাঁর দুই হাত হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে থেঁতলে দিয়েছিল। উপড়ে ফেলেছিল আঙুলের নখ।
দীর্ঘ বিবরণ দেন নাসের বখতিয়ার। তিনি বলেন, তাঁদের প্রত্যেককেই পেটানো, লাথি মারা, গায়ে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরাসহ প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়েছিল। তবে আলতাফ মাহমুদকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তা ছিল আরও ভয়ংকর। আটকের পরপরই তাঁর কপালে বেয়োনেট দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। অনেকটা চামড়া কেটে ঝুলে পড়েছিল। নির্যাতনের সময় তাঁকে উল্টো করে ঝুলিয়ে ক্রমাগত পেটানো হতো। তাঁকে ওরা প্রশ্ন করত উর্দুতে। তিনি উত্তর দিতেন বাংলায়। তাঁর মুখ দিয়ে ওরা একটিও উর্দু শব্দ বের করতে পারেনি। সত্যিকারের মহান মানুষ ছিলেন তিনি।
খায়রুল আলম বিল্লাহ ও লিনু বিল্লাহ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারাহ আরা মাহমুদের ভাই। খায়রুল আলম বড়। তিনি বলেন, ১০ আগস্ট সকালে তাঁদের বাড়ি হানাদার সৈনিকেরা ঘেরাও করে। ওরা আলতাফ মাহমুদকে খুঁজছিল। তিনি লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরা ছিলেন। সেই অবস্থাতেই তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নেয়। সঙ্গে তাঁদেরও।
খায়রুল আলম বিল্লাহ বলেন, ‘মৃত্যুর আগেও আলতাফ মাহমুদ তাঁদের সাহস দিয়েছেন। বলেছেন, ওরা যতই নির্যাতন করুক, কারও নাম বলবে না। না বললেও মারবে, বললেও মারবে। কাজেই মুখ বন্ধ করে রাখবে।’
লিনু বিল্লাহ বলেন, ‘তাঁদের যখন নির্যাতন করা হচ্ছিল, আলতাফ মাহমুদ হানাদারদের বলেছিলেন, “অস্ত্র আমি রেখেছি। ওরা কিছু জানে না। ওদের ছেড়ে দিন।” আমাদের তিন দিন পরে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।’
স্মৃতিচারণার পর অলকা ফওজিয়া, শর্মিলা জুলি ও লিনু বিল্লাহর পরিবেশনায় শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুর করা গান দিয়ে শেষ হয় এই আয়োজন।