বেনামে কোম্পানির মালিক হওয়া যাবে না, সংশোধন হচ্ছে আইন

· Prothom Alo

আন্তর্জাতিক গেটওয়ে কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কে টেল লিমিটেডের প্রায় ১২৬ কোটি টাকার টেলিযোগাযোগ বিল বকেয়া ছিল। কোম্পানিটির মালিকানা হস্তান্তর দেখানো হয় এমন তিন ব্যক্তির নামে, যাঁরা বাস্তবে এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। তাঁদেরই একজন সাখাওয়াত হোসেন।

Visit mwafrika.life for more information.

২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। পরে তদন্তে ওঠে আসে, ঘটনার নেপথ্যে ছিল আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে, তা শনাক্ত করার আইনি ব্যবস্থা না থাকায় এমন ঘটনা ঘটার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

একইভাবে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার ধারণ করেছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে তাঁদের সম্মিলিত শেয়ার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২২ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর পর্ষদে এস আলমের জামাতা বেলাল আহমেদসহ তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য ছিলেন। বেশির ভাগ শেয়ার নামে-বেনামে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণও বের করে নেয় এস আলম গ্রুপ, যা এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

বেনামি শেয়ারের মালিকানা নিয়ে দেশের বাইরে যুক্তরাজ্যেও একটি বহুল আলোচিত ঘটনা রয়েছে। দেশটির আদালতে এটি অ্যান্ড্রু রুহান ও অ্যান্থনি স্টিভেন্স মামলা নামে পরিচিত। ঘটনাটি ২০০৪-২০০৫ সালের। দেশটির ব্যবসায়ী অ্যান্ড্রু রুহান কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লন্ডনের তিনটি হোটেল কেনেন। হোটেলগুলো অ্যান্থনি স্টিভেন্সের মালিকানাধীন বলে সবাই জানতেন। পরে আদালতে প্রমাণিত হয়, সেগুলোর প্রকৃত মালিক অ্যান্ড্রু রুহান। হোটেলগুলোর কেনাবেচা থেকে রুহান বিপুল মুনাফা করেন। আদালত তাঁর গোপনে অর্জিত মুনাফার হিসাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

* কাগজে শেয়ারের মালিক একজন, কিন্তু কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ অন্যজনের হাতে—এমন গোপন মালিকানা শনাক্ত করতে আইনে নতুন ধারা যুক্ত হচ্ছে।* ৪০টি ধারায় পরিবর্তন এনে ৩৫ বছর পর কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ আইন সংশোধনের উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় বেনামি বা মনোনীত শেয়ারধারীর আড়ালে প্রকৃত মালিকানা। এ ধরনের ঘটনা দেশে আর ঘটতে দিতে চায় না সরকার। কাগজে শেয়ারের মালিক একজন, কিন্তু কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ অন্যজনের হাতে—এমন গোপন মালিকানা শনাক্ত করতে তাই কোম্পানি আইনে নতুন ধারা যুক্ত হচ্ছে।

এটিসহ ৪০টি ধারায় পরিবর্তন এনে ৩৫ বছর পর কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আইন প্রণয়নের পর দুবার ছোট সংশোধন হয়েছে। বড় ধরনের সংশোধন হচ্ছে এবারই। সংশোধনীর প্রাথমিক খসড়ায় এবার কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ, ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণ এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

খসড়াটি এখন চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠক হওয়ার কথা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে। এরপর এটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে তা সংসদে উত্থাপন করা হবে। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর খসড়াটি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আইন সংশোধন হলে কাগজে-কলমে কোম্পানির শেয়ারের মালিক একজন, কিন্তু বাস্তবে অন্যজন; এমন পরিস্থিতি আর থাকবে না। অর্থাৎ প্রকৃত মালিকের নাম, পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হবে, এমন ধারা সংযোজন করা হচ্ছে কোম্পানি আইনে। আর কোম্পানির সংঘস্মারক সংশোধনের এখতিয়ার আসছে আদালতের বদলে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের (আরজেএসসি) কাছে।

কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা, ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণ এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানোই সংশোধনীর প্রধান লক্ষ্য। এবারের সংশোধনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বাণিজ্য সহজকীকরণ, সেবাগুলোকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর ও স্বচ্ছতা। তার অংশ হিসেবেই কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নতুনভাবে ৩৪(ক) ধারা যুক্ত করে বলা হয়, শুধু কাগজে-কলমে শেয়ারধারী ব্যক্তিই নন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও প্রকৃত মালিক হিসেবে গণ্য করা হবে। মালিকানা পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন ঘোষণা দিতে হবে এবং নির্ধারিত ফরমে কোম্পানিকে এসব তথ্য জমা দিতে হবে নিবন্ধকের কাছে। প্রকৃত মালিকানার ঘোষণা না দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন বাড়তি জরিমানা গুনতে হবে ১০০ টাকা করে।

নতুন এ ধারা কার্যকর হলে অন্যের নামে শেয়ার রেখে প্রকৃত মালিকানা গোপন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, অর্থ পাচার ও গোপন নিয়ন্ত্রণ শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্যও কোম্পানির মালিকানা–সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া সহজ হবে।

আদালতের বদলে আরজেএসসির নিবন্ধক

বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে সংঘস্মারক সংশোধনে আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে নিবন্ধকের অনুমোদনের ব্যবস্থা আনার কথা বলা হয়েছে। কোম্পানির উদ্দেশ্য পরিবর্তন, ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, নতুন ব্যবসা যুক্ত করা বা কোনো উদ্যোগ বিক্রি বা একীভূত হওয়ার মতো বিষয়ে আদালতের পরিবর্তে সিদ্ধান্ত দেবেন নিবন্ধক। বলা হয়েছে, ব্যবসা সহজ করা এবং সংঘস্মারক সংশোধনের জটিলতা কমাতেই এ পরিবর্তন করা উচিত।

তবে এ ক্ষেত্রে কোম্পানির সদস্য, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এমন ব্যক্তি এবং পাওনাদারদের স্বার্থরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ বা পাওনাদারকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। নিবন্ধকের সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত মাশুল দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করতে পারবেন। অর্থাৎ আদালতের পরিবর্তে প্রশাসনিক অনুমোদন ও আপিলের কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় কমানো সম্ভব হবে।

ফজলুল হক, প্রশাসক, এফবিসিসিআইকোম্পানি আইনকে যুগোপযোগী করা আরও আগেই দরকার ছিল। এক যুগের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে কাজ চলছে। তবে এবার যে গতিতে এগোচ্ছে, আইন সংশোধন হবেই।

এদিকে কোম্পানি নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণে কাগজের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কাগজের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে রেকর্ড, নোটিশ, চুক্তি, ফরম সংরক্ষণ করতে হবে।

আবার শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় হস্তান্তরকারীর স্বাক্ষর যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন খসড়ায় সশরীর উপস্থিতির পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমেও সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দূতাবাসের অনুমোদিত কর্মকর্তার মাধ্যমে নথি সত্যায়নের ব্যবস্থাও বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

জরিমানা বাড়বে, সময়সীমা ৩০ দিন

কিছু ক্ষেত্রে আইন অমান্যের জরিমানা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান কোম্পানির নামের সঙ্গে বিভ্রান্তিকরভাবে কোনো কোম্পানির নাম মিলে গেলে নিবন্ধন পাবে না নতুন কোম্পানি। যদি নিবন্ধিত হয়েই যায়, কোম্পানিকে নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেবে সরকার। এ নির্দেশ অমান্য করলে বর্তমানে প্রতিদিন কোম্পানির জন্য ৫০০ টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জন্য ১০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৫ হাজার ও ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘সচিব’ শব্দের পরিবর্তে ‘কোম্পানি সচিব’ ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সচিব পদের সঙ্গে বিভ্রান্তি দূর করার প্রস্তাব রয়েছে।

একক মালিকানার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কোম্পানি কাঠামোয় আনার সুযোগ বাড়াতে এক ব্যক্তির কোম্পানি নিয়ে বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এ ধরনের কোম্পানিকে পরে প্রাইভেট বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের সুযোগও রাখার কথা বলা হয়েছে।

পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির নামে ‘পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি’ বা ‘পিএলসি’, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির নামে ‘লিমিটেড’ বা ‘লি.’এবং এক ব্যক্তির কোম্পানির নামে ‘ওয়ান পারসন কোম্পানি’ বা ‘ওপিসি’ ব্যবহারের বিধান থাকছে আগের মতোই।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, কোম্পানি আইনকে যুগোপযোগী করা আরও আগেই দরকার ছিল। এক যুগের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে কাজ চলছে। তবে এবার যে গতিতে এগোচ্ছে, আইন সংশোধন হবেই।

ফজলুল হক আরও বলেন, আইনের সঠিক প্রয়োগের জন্য আরজেএসসিকে শক্তিশালী ও গতিশীল করা অতীব জরুরি। শেয়ার হস্তান্তরে সশরীর উপস্থিতি ছাড়া দপ্তরটির সব কাজই অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

Read full story at source