দুই সেকেন্ড ব্যবধানে শাদাবকে নতুন ‘জীবন’ হারিসের, তারপর অদ্ভুত আবদার
· Prothom Alo
ক্রিকেটে সাফল্যের একটা অদ্ভুত সমীকরণ আছে। আপনি কতটা ভালো খেলোয়াড়, সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও কখনো কখনো বড় হয়ে ওঠে আপনি কতটা ভালো খেলতে চান। কতটা ক্ষুধার্ত সাফল্যের জন্য।
দুর্ভাগ্য, এই ক্ষুধা মাপার কোনো যন্ত্র নেই। থাকলে হয়তো বোঝা যেত, একজন ভালো খেলোয়াড় আর একজন অসাধারণ খেলোয়াড়ের মধ্যে আসল পার্থক্যটা কোথায়।
Visit h-doctor.club for more information.
তবে একটা উপায় আছে। কোনো খেলোয়াড় যখন মরিয়া হয়ে কিছু পেতে চান, তখন তাঁর আচরণটা দেখুন। অনেক উত্তর পেয়ে যাবেন।
২০১৭ সালের এক গ্রীষ্মের দুপুরের কথা মনে পড়ে কিনা দেখুন। লন্ডনে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। পাকিস্তানের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ প্রথম ওভার করতে এসেছেন। মুখে তখনো কৈশোরের ছাপ। নাম শাদাব খান। এর কিছুক্ষণ আগেই বিরাট কোহলির ক্যাচ ধরেছেন। আগের বলেই কোহলির ক্যাচ ফেলে পাকিস্তানকে হতাশ করেছিলেন আজহার আলী। পরের বলে সেই হতাশা দূর করেন শাদাব। এবার তাঁর সামনে যুবরাজ সিং। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে থাকা সেই মানুষটির ব্যাটে তখনো বোলারদের তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা। বিশ্বাস না হলে স্টুয়ার্ট ব্রডকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।
শাদাবের বল যুবরাজের প্যাডে লাগল। আবেদন করলেন। আম্পায়ার আউট দিলেন না। কিন্তু শাদাব নাছোড়বান্দা। রিভিউ নিতেই হবে। বোলারদের এলবিডব্লুর আবেদন নিয়ে একটা পুরোনো রসিকতা আছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো রিভিউ নেওয়ার জন্য অধিনায়ককে রাজি করানো। আর সেই বোলার যদি হন ১৮ বছরের এক তরুণ, তাহলে তো কথাই নেই! কিন্তু শাদাবের আত্মবিশ্বাস সেদিন মিথ্যা বলেনি। ডিআরএসে তিনটি লাল সংকেত। যুবরাজ আউট।
শাদাব মূলত লেগ স্পিনার হলেও ব্যাটিংও ভালোই পারেনসেই শাদাবের বয়স এখন ২৭। মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় নয় বছর। বদলে গেছে অনেক কিছু। সবচেয়ে বেশি বদলেছে সম্ভবত তাঁর ক্রিকেটজীবন। ২০১৭ সালের সেই আত্মবিশ্বাসী তরুণ গত কয়েক বছরে হয়ে উঠেছেন এক মরিয়া ক্রিকেটার। সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার সঙ্গেই যাঁর দেখা হয়েছে বেশি। গতকাল লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ম্যাচে সেই মরিয়া শাদাবকে আবার দেখা গেল।
দুটি রিভিউ। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প। প্রথমটি ২৮তম ওভারে। ইংল্যান্ডের ৪ উইকেট পড়ে গিয়েছিল পঞ্চাশের কিছু বেশি রানে। কিন্তু বেন ডাকেট ও স্যাম কারেন পঞ্চম উইকেটে জুটি গড়ে ম্যাচটা ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ডাকেট এগোচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। পাকিস্তানের অধিনায়কও যেন আক্রমণের বদলে আত্মরক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন। একের পর এক ওভার করাচ্ছেন স্পিনারদের দিয়ে। অথচ বল তেমন বিপজ্জনক হচ্ছে না। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে বল করলেন শাদাব। বল ঘুরে ডাকেটের প্যাডে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে প্রবল আবেদন। সেই ২০১৭ সালের মতোই আত্মবিশ্বাস। কিন্তু এবার আর ভাগ্য সহায় হলো না। রিভিউ নষ্ট পাকিস্তানের।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কাল অ্যাকশনে শাদাবশাদাবের সাম্প্রতিক বোলিং পরিসংখ্যান দেখলে অবশ্য তাঁর এমন মরিয়া হওয়ার কারণটা বোঝা যায়। ২০২৩ সালের আগে ওয়ানডেতে ৫১ ম্যাচে ৭০ উইকেট নিয়েছিলেন শাদাব। বোলিং গড় ৩১.৬, ইকোনমি রেট ৫.০৯। এরপর? ২০২৩ সাল থেকে ২০ ইনিংসে মাত্র ১৭ উইকেট। বোলিং গড় বেড়ে ৫৪, ইকোনমি রেট ৫.৬৪। একটি উইকেট পেতে গড়ে ৫৭.৫ বল করতে হয়েছে। পতনটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে ২০২৩ বিশ্বকাপে। স্পিনারদের সহায়ক উইকেটেও শাদাব নিতে পেরেছিলেন মাত্র ২ উইকেট। গতকাল ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে শাদাব নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমার পারফরম্যান্স যে ভালো ছিল না, সেটা তো সত্যি।’
কিন্তু দ্বিতীয় রিভিউ? সেটা যেন কোনো ক্রিকেট ম্যাচের ঘটনা নয়। রূপকথার শেষ অধ্যায়।
শাদাবের সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানের অবিশ্বাস্য জয়, শেষ জুটিতে রেকর্ডপাকিস্তান ক্রিকেটের গত দুই বছরের গল্পটা সুখের নয়। সমর্থকদের আনন্দের উপলক্ষ খুব কমই এসেছে। জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তারপর কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে সব ভেঙে পড়ে। ইংল্যান্ডের ২৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারানোর পরও তাই পাকিস্তানের সমর্থকেরা আর কতটুকুই বা আশা করতে পারেন! মাঠে শাদাব খান। সঙ্গী ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান হারিস রউফ। কিন্তু দুজন মিলে যা শুরু করলেন, তা যেন ক্রিকেটের চেনা নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। একদিকে হারিস হয়ে উঠলেন দেওয়াল। অন্যদিকে শাদাবের ব্যাটে অবিশ্বাস্য সব শট।
প্যাডল সুইপ, রিভার্স সুইপ। কখনো চার, কখনো ছক্কা। রিভার্স কাট, আপার কাট, কোমরের কাছ থেকে কবজির মোচড়ে ফ্লিক। ক্রিকেট ব্যাটিংয়ের কত রকম শিল্প যে আছে, তার যেন একটা ছোটখাটো প্রদর্শনী! আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, শাদাবের ব্যাটিংয়ে কোনো দ্বিধা নেই। কোনো জড়তা নেই। বল আসছে, ব্যাট ঘুরছে। নিখুঁত টাইমিংয়ে বল ছুটছে বাউন্ডারির দিকে।
.@HarisRauf14 and @76Shadabkhan unplugged ️ The belief, the banter and the behind-the-scenes story of an unforgettable chase #PAKvENG | #CricketKaJashan | #PinkDay https://t.co/f74XQzdiQO
— Pakistan Cricket (@TheRealPCB) October 25, 2026
তারপর এল ৪৫তম ওভার। গাস অ্যাটকিনসনের বল শাদাবের প্যাডে। আম্পায়ারের আঙুল উঠল। অ্যাটকিনসন উল্লাসে ছুটলেন। পাকিস্তানের জিততে তখনো ২০ রান দরকার। শাদাব ৯৭ রানে। দেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৩ রান দূরে। সব শেষ!
হতাশায় ব্যাট দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন শাদাব। এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে রিভিউ নেওয়ার কথাও ভুলে গেছেন। টাইমারে তখন আর মাত্র দুই সেকেন্ড। হঠাৎ হারিস রউফের তাড়া, ‘রিভিউটা কি বাড়িতে নিয়ে যাবে নাকি?’ পরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে শোনা গেছে হারিসের সেই কথা।
শেষ মুহূর্তে রিভিউ নিলেন শাদাব। আলট্রাএজে দেখা গেল ছোট্ট একটা স্পাইক। বল ব্যাট ছুঁয়েছে! নট আউট। শাদাব বেঁচে গেলেন। পাকিস্তানও। মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শাদাব ও হারিস। যেন নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারছেন না, এত দিন পর ভাগ্য সত্যিই তাঁদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে!
তবে ভাগ্যকে পাশে পাওয়ার জন্য শাদাবকে যে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে, সেটাও মনে রাখা দরকার। ২০২২ সাল পর্যন্ত ওয়ানডেতে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ২৪.১, স্ট্রাইক রেট ৭১.৪। দলে প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানদের সহযোগিতা করাই ছিল মূল কাজ। একাদশে তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল বোলার। ব্যাট হাতে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পুরোটা তখনো বেরিয়ে আসেনি। টি-টুয়েন্টিতেও ২০২২ সাল পর্যন্ত স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩০-এর নিচে।
এরপর থেকেই বদল। ২০২২ সাল থেকে টি-টুয়েন্টিতে তাঁর স্ট্রাইক রেট বেড়ে হয়েছে ১৪৪। ওয়ানডেতেও ব্যাটিং গড় প্রায় ৪০, স্ট্রাইক রেট ১০০। আরও চমকপ্রদ তথ্য আছে। ওয়ানডেতে সাত বা তার নিচের পজিশনে ব্যাট করা ক্রিকেটারদের মধ্যে এই সময়ে শাদাবের চেয়ে বেশি গড় শুধু নিউজিল্যান্ডের মাইকেল ব্রেসওয়েলের। একসময় যাঁদের ছায়ায় ব্যাটিং করতেন, এখন তাঁদের মতোই নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছেন শাদাব। কীভাবে সম্ভব হলো এই বদল?
From heartbreak to glory in an instant @76Shadabkhan survives, Pakistan believe and the rest is history! #PAKvENG | #CricketKaJashan | #PinkDay https://t.co/ZXNHms5jFI
— Pakistan Cricket (@TheRealPCB) October 25, 2026
ম্যাচ শেষে সম্প্রচারককে শাদাব বলেছেন, ‘ব্যাটসম্যান হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে আমার ফর্ম ভালো। সে কারণেই বিশ্বাস ছিল, ম্যাচটা জেতাতে পারব।’ বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার অভিজ্ঞতাও কাজে লেগেছে। বিশ্বের বড় বড় পাওয়ার হিটারদের কাছ থেকে শিখেছেন অনেক কিছু। শাদাবের ভাষায়, ‘আমরা আগে যতটা সম্ভব জোরে বল মারার চেষ্টা করতাম। কিন্তু ওরা ব্যাপারটা খুব সহজ রাখে।’
ব্যাট সুইং, টাইমিং। এই মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক থাকলেই যে বলকে অনেক দূরে পাঠানো যায়, সেটাই শিখেছেন শাদাব। লাহোরে তারই প্রদর্শনী।
দেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরি। সেটাও এমন এক রান তাড়ায়, যেটা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে বলে ধরে নিয়েছিলেন সবাই। শেষ উইকেটে জুটি গড়ে দলকে জেতানো। এর চেয়ে ভালোভাবে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করা যায়? শাদাবের অবশ্য প্রমাণ করার দায়টা অনেক দিনের।
পাকিস্তানের স্পিন বোলিংয়ে এখন প্রতিভার অভাব নেই। তাই শাদাবের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। তরুণদের সুযোগ আটকে রাখার অভিযোগ আছে। স্বজনপ্রীতির সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। কেউ কেউ বলেন, শাদাব নাকি কোচের প্রিয়পাত্র। বিশেষ করে বল হাতে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের পর সমালোচনার সবটাই যে অযৌক্তিক, তা বলার উপায় নেই।
একটি অসাধারণ ইনিংসেই এসব অভিযোগ থেমে যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। শাদাব নিজেও সেটা জানেন। তাঁর কথায়, ‘আমার ক্যারিয়ারে অনেক উত্থান-পতন এসেছে। অনেক সমালোচনা শুনেছি। এখন আমার মানসিকতা এমন হয়ে গেছে যে ভালো খেলি বা খারাপ, আমাকে নিয়ে নেতিবাচক কথাই হবে।’ তাই নিজের জন্য একটা নিয়ম ঠিক করেছেন, ‘মাঠে নামলে শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি যা পারি, সেটাই করার চেষ্টা করি।’
কিন্তু লাহোরে শাদাব যা করেছেন, সেটা সম্ভবত তাঁর নিজের চেয়েও বেশি দরকার ছিল পাকিস্তান ক্রিকেটের। কারণ, পাকিস্তান ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্যটা কোথায়? যখন কিছুই হওয়ার কথা নয়, ঠিক তখনই অবিশ্বাস্য কিছু ঘটে যাওয়া।
ম্যাচ জিততে শাদাবের সেঞ্চুরি সম্ভবত তাঁর নিজের চেয়েও বেশি দরকার ছিল পাকিস্তানেরযে দল ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে বসে, সেই দলই শেষ উইকেটে এমন এক জুটি গড়ে যে ইতিহাসের ৫১ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে যায়! ১৯৭৫ সাল থেকে ওয়ানডেতে সফল রান তাড়ায় দশম উইকেটের সর্বোচ্চ জুটির যে রেকর্ড টিকে ছিল, সেটাই ভেঙেছেন শাদাব ও হারিস। অথচ শেষ দিকে হারিসের আবদারটা শুনলে হাসি পাবে।
ইংল্যান্ড ফিল্ডারদের কাছে এনে হারিসকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছিল। শাদাব তাঁকে বলেছিলেন, কোনোভাবে একটা সিঙ্গেল নিয়ে প্রান্ত বদল করতে। হারিস রাজি নন।
শাদাবের ভাষ্য অনুযায়ী, হারিস বলেছিলেন, ‘জয়সূচক শটটা আমিই মারব’ এবং সেটাই করেছেন! চার মেরে পাকিস্তানকে জিতিয়েছেন হারিস।
ভাবা যায়!
হয়তো যায়। পাকিস্তান ক্রিকেট তো চিরকালই এমন। যখন মনে হয় সব শেষ, তখনই কোথা থেকে যেন নতুন একটা গল্প শুরু হয়।
কখনো শাদাবের, কখনো হারিসের!