বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম: এখন সময় নতুন করে ভাবার

· Prothom Alo

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিয়ে আগ্রহ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্যোক্তা ক্লাব গড়ে উঠেছে, নিয়মিত আয়োজন হচ্ছে স্টার্টআপ প্রতিযোগিতা, হ্যাকাথন, ইনকিউবেশন ও অ্যাকসেলারেশন কর্মসূচি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীরাও তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করছেন। কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে।

Visit newsbetsport.bond for more information.

আমরা কি এমন একটি উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলছি, যেখানে তরুণেরা বাস্তব ব্যবসা গড়তে শিখছে, না আমরা অজান্তেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছি, যেখানে সুন্দরভাবে ব্যবসার ধারণা উপস্থাপন করাই মূল দক্ষতায় পরিণত হচ্ছে? প্রশ্নটি করার কারণ আছে।

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার চিত্র অনেকটাই একই রকম। শিক্ষার্থীরা একটি ধারণা তৈরি করে, দল গঠন করে, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা লেখে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে বিচারকদের সামনে সেটি উপস্থাপন করে। অনেক ক্ষেত্রে উপস্থাপনা অত্যন্ত পরিপাটি হয়। বাজারের আকার, সম্ভাব্য আয়, ব্যবসায়িক মডেল, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ, এমনকি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য মূল্যায়নও সেখানে থাকে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন অনেক সময় অনুপস্থিত থেকে যায়। এই ধারণার জন্য কি একজন বাস্তব গ্রাহক অর্থ দিতে রাজি হয়েছেন? কারণ উদ্যোক্তার প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় কোনো মঞ্চে নয়, বাজারে। একজন মানুষ যখন অন্য একজন মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করেন এবং সেই সমাধানের বিনিময়ে অর্থ পান, তখনই একটি ব্যবসার জন্ম হয়। উপস্থাপনা তার পরে আসে। এখানেই উদ্যোক্তা শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

আমরা অনেক সময় উদ্যোক্তা তৈরির প্রক্রিয়াটিকে উল্টোভাবে সাজিয়ে ফেলছি। প্রথমে ধারণা, তারপর উপস্থাপনা, তারপর প্রতিযোগিতা, এরপর ইনকিউবেশন, তারপর বিনিয়োগ। অথচ বাস্তব ব্যবসার পথ সাধারণত ভিন্ন। প্রথমে একটি সমস্যা চিহ্নিত হয়। তারপর বোঝা হয় মানুষ সত্যিই সেই সমস্যায় ভুগছে কি না। এরপর একটি ব্যবহারযোগ্য সমাধান তৈরি হয়। প্রথম গ্রাহক আসে। গ্রাহকের মতামতের ভিত্তিতে পণ্য বা সেবা পরিবর্তিত হয়। ধীরে ধীরে একটি টেকসই ব্যবসা গড়ে ওঠে। বিনিয়োগ তখন একটি সম্ভাবনা হতে পারে, শুরু নয়।

অবশ্যই ব্যবসার ধারণা উপস্থাপন করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদ্যোক্তাকে নিজের ভাবনা পরিষ্কারভাবে বোঝাতে জানতে হবে। বিনিয়োগকারী, অংশীদার কিংবা গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এটি অপরিহার্য। কিন্তু উপস্থাপনা উদ্যোক্তার একটি দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার পরিচয় নয়। বাস্তব বাজারে টিকে থাকার জন্য দরকার গ্রাহককে বোঝার ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, বিক্রয় দক্ষতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। আমরা প্রায়ই স্টার্টআপকে উদ্যোক্তার একমাত্র পরিচয় হিসেবে তুলে ধরি। অথচ দেশের অর্থনীতির বড় অংশই গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। একটি ছোট ব্যবসা যদি নিয়মিত আয় করে, ৫ বা ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে, তবে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা উদ্যোগ। সব উদ্যোক্তার লক্ষ্য যে একদিন বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান গড়া হবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মতও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়।

উদ্যোক্তা উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। তরুণদের আমরা ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করি। কিন্তু যখন তারা প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে যায়, তখন তাদের কাছে চাওয়া হয় জামানত, আয়ের ইতিহাস এবং ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা। ব্যাংকের অবস্থান অযৌক্তিক নয়। তারা আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে কাজ করে, তাই ঝুঁকি মূল্যায়ন করেই ঋণ দিতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে প্রাথমিক পর্যায়ের নতুন উদ্যোক্তার বাস্তবতা প্রচলিত ঋণব্যবস্থার সঙ্গে সব সময় মেলে না।

এই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য অ্যাঞ্জেল বিনিয়োগ, সিড ফান্ড, উদ্ভাবন তহবিল, ক্রেডিট গ্যারান্টি এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এই ধরনের অর্থায়নের সুযোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি ভালো ধারণা অর্থের অভাবে থেমে গেলে শুধু একজন উদ্যোক্তার ক্ষতি হয় না; সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মূল্যও হারিয়ে যায়।

তবে শুধু অর্থায়ন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। উদ্যোক্তা উন্নয়নকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখতে হবে।

• এখানে সরকারের ভূমিকা হলো এমন নীতিগত পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নতুন ব্যবসা শুরু করা সহজ হবে, নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ উৎসাহ পাবে এবং সরকারি সেবাগুলো উদ্যোক্তাবান্ধব হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্ভাবনী উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, এমপি, তরুণদের উদীয়মান দক্ষতা (Emerging Skills), কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই ভিশন বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উদ্যোক্তা, শিল্প খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত অংশগ্রহণ। সঠিক মানুষ, সঠিক প্রক্রিয়া এবং ফলাফলভিত্তিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রীর এই ভিশন সফলভাবে বাস্তব রূপ পেতে পারে।

•        বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আরও গভীর। উদ্যোক্তা শিক্ষা শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের বাস্তব বাজারে নিয়ে যেতে হবে। সম্ভাব্য গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলা, বাজার যাচাই করা, বিক্রয় শেখা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা বোঝা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা, ব্যবসায়িক নৈতিকতা এবং মেধাস্বত্ব সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এখন উদ্যোক্তা শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল কতজন উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন, তা দিয়ে নয়; বরং কতজন টেকসই ব্যবসা গড়লেন, সেটিও বিবেচনায় আসা উচিত।

•        আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সব উদ্যোক্তার কাছে জমি বা ভবন থাকবে না। অনেকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে তাদের দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী চিন্তা। তাই প্রচলিত ঋণের পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়ন, ক্যাশ ফ্লোভিত্তিক মূল্যায়ন এবং উদ্যোক্তাবান্ধব আর্থিক পণ্য নিয়ে ভাবার সুযোগ রয়েছে।

•        শিল্প খাত ও বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা শুধু স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষক না হয়ে নতুন উদ্যোক্তাদের প্রথম গ্রাহক হতে পারে, পরীক্ষামূলকভাবে তাদের সমাধান ব্যবহার করতে পারে, সরবরাহব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে এবং বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান তৈরির জন্য তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে পারে। একজন উদ্যোক্তার জন্য প্রথম বড় গ্রাহক অনেক সময় প্রথম বিনিয়োগকারীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

•        বিনিয়োগকারীদের ভূমিকাও কেবল অর্থায়নে সীমাবদ্ধ নয়। একজন ভালো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠাতাকে বাজার বোঝাতে সাহায্য করেন, অভিজ্ঞতা ভাগ করেন, নতুন যোগাযোগ তৈরি করেন এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে পাশে থাকেন। শুধু আকর্ষণীয় উপস্থাপনা নয়, প্রতিষ্ঠাতার শেখার ক্ষমতা, বাস্তব অগ্রগতি এবং গ্রাহকের আস্থাকেও মূল্যায়নের অংশ করা উচিত।

•        সবশেষে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতিও একটি প্রত্যাশা রয়েছে। উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু একটি নতুন ধারণা নিয়ে কথা বলা নয়; বরং একটি সমস্যাকে গভীরভাবে বোঝা, মানুষের জন্য কার্যকর সমাধান তৈরি করা এবং সেই সমাধানের প্রতি মানুষের আস্থা অর্জন করা। প্রথম বিনিয়োগ পাওয়ার আগে প্রথম সন্তুষ্ট গ্রাহক পাওয়ার আনন্দ ও শিক্ষা অনেক বেশি মূল্যবান।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার এবং নতুন প্রযুক্তির বিস্তার উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এই সম্ভাবনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা।

আমাদের লক্ষ্য শুধু আরও বেশি স্টার্টআপ তৈরি করা নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বেশি টেকসই উদ্যোক্তা তৈরি করা, যাঁরা বাস্তব সমস্যার সমাধান করবেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন, নতুন বাজার তৈরি করবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সংযোজন করবেন।

কারণ শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তার পরিচয় কোনো উপস্থাপনা, পুরস্কার বা বিনিয়োগে নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় হলো তিনি মানুষের জন্য এমন একটি মূল্য সৃষ্টি করেছেন, যার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত। সেই ভিত্তির ওপরই গড়ে ওঠে একটি টেকসই ব্যবসা, আর সেই ব্যবসার ওপরই দাঁড়ায় একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম।

*লেখক: কে এম হাসান রিপন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন গবেষক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গ্লোবাল এন্টারপ্রেনিউরশিপ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (GEN Bangladesh)

Read full story at source