ইসলাম যেভাবে সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল করতে বলে

· Prothom Alo

পারিবারিক শিক্ষার একটি মূল প্রশ্ন সামনে আসে—পারিবারিক শিক্ষার আসল কাজ কি সন্তানকে জীবনের সব চড়াই-উতরাই থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, নাকি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাদের প্রস্তুত করা?

অনেক বাবা-মা মনে করেন, সন্তানের পথের সব বাধা দূর করে দেওয়াই অভিভাবক হিসেবে তাঁদের বড় সাফল্য। কিন্তু বাস্তবসম্মত ও সুষম লালন-পালনের আসল প্রভাব বোঝা যায় তখন, যখন সন্তান জীবনের বাধাগুলো নিজের বুদ্ধিমত্তা ও শক্তিতে অতিক্রম করতে শেখে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

অভিজ্ঞতার সুযোগ কেড়ে নেওয়া

সন্তান যখনই কোনো সমস্যা বা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, বাবা-মা যদি নিজেই দ্রুত সমাধান করে দেন, তবে সন্তান নিজে ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ হারায়। অতিরিক্ত ভীতি বা উদ্বেগের কারণে সন্তানের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটা খুঁটিনাটিতে হস্তক্ষেপ করলে তাদের শেখার পরিধি ছোট হয়ে আসে।

সম্পদ ও সন্তান লাভের জন্য প্রার্থনা

সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন উল্লেখ করেছেন যে কোনো বিষয় শুধু তাত্ত্বিকভাবে জানা আর বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে সেটিতে স্থায়ী দক্ষতা অর্জন করার মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। এই পারদর্শিতা বারবার চর্চা ছাড়া গড়ে ওঠে না। (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১/৫৪৩, বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৯৮৮)

সমর্থন বনাম অতি-সুরক্ষা

কৈশোরকালীন মনস্তত্ত্ব নিয়ে করা এক আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ—যেমন অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ প্রকাশ করা, অনাহুত সাহায্য করা বা ব্যক্তিগত বিষয়ে অতিরিক্ত কৌতূহল দেখানোকে কিশোর-কিশোরীরা মানসিক নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা হিসেবে দেখে (মার্টজে পি. সি. এম. লাইক ও অন্যান্য, ‘ওভারপ্যারেন্টিং ইন অ্যাডোলেসেন্টস এভরিডে লাইফ’, জার্নাল অব সোশ্যাল অ্যান্ড পার্সোনাল রিলেশনশিপস, ভলিউম: ৪১, সংখ্যা: ২, ২০২৪, পৃষ্ঠা: ৪৮০-৪৯)

গবেষকরা জানান, সকল হস্তক্ষেপই অতি-সুরক্ষা নয়; দেখতে হবে সেই সাহায্যের সত্যিই প্রয়োজন আছে কি না এবং তা সন্তানের বয়স ও দক্ষতার সঙ্গে মানানসই কি না। (আর. ডিস্টিফানো এবং এ. এস. মিউইসেন, ‘প্যারেন্টিং ইন কনটেক্সট: আ সিস্টেমেটিক রিভিও অব দ্য কোরিলেটস অব অটোনমি সাপোর্ট’, জার্নাল অব ফ্যামিলি থিওরি অ্যান্ড রিভিও, খণ্ড: ১৪, সংখ্যা: ৪, ২০২২, পৃষ্ঠা: ৫৭১-৫৯২)

মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার ‘আত্ম-সক্ষমতা’ তত্ত্ব নিশ্চিত করে যে একজন মানুষ নিজের চেষ্টায় কোনো কাজে সফল হলে তার মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, তা শুধু কথার কথায় অর্জিত হয় না। (সেলফ-ইফিকেসি: দ্য এক্সারসাইজ অব কন্ট্রোল, নিউ ইয়র্ক: ডব্লিউ. এইচ. ফ্রিম্যান, ১৯৯৭, অধ্যায়: ৩)

যেদিন সম্পদ ও সন্তান কোনো কাজে আসবে না

ইসলামি জীবনদর্শন: চেষ্টা ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা

ইসলামি মূল্যবোধেও মানুষকে তার নিজস্ব চেষ্টা ও কর্মের ওপর দায়বদ্ধ করা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, “মানুষ তা-ই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে। আর তার চেষ্টার ফল শীঘ্রই তাকে দেখানো হবে।” (সুরা নাজম, আয়াত: ৩৯-৪০)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত কাজের জন্য দায়ী।” (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩৮)

এই আয়াতগুলোর মধ্য দিয়ে একটি গভীর পারিবারিক শিক্ষার দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়—সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নিজের কাজের ভালো-মন্দের পরিণতি বহন করতে শেখানো প্রয়োজন। ভাষাবিদ রাগেব ইসফাহানি ‘চেষ্টা’ (সাঈ) এবং ‘অর্জন’ (কসব)-এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, মানুষের নিজস্ব অধ্যবসায় ও লাভ-ক্ষতির বিচার থেকেই তার জীবনের মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে। (মুফরাদাতু আলফাজিল কোরআন, সম্পাদনা: সফওয়ান আদনান দাউদি, দামেস্ক: দারুল কলাম, ২০০৯, পৃষ্ঠা: ৪০৭)

‘খেজুর গাছে পরাগায়ন’-এর ঘটনায় মহানবী (সা.) সাহাবিদের একটি নির্দিষ্ট চাষপদ্ধতি সম্পর্কে মন্তব্য করার পর যখন দেখা গেল ফসল আশানুরূপ হয়নি, তখন তিনি সরল ভাষায় বললেন, “তোমাদের পার্থিব বিষয়ে তোমরাই সবচেয়ে ভালো জানো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৬৩)

এই হাদিস প্রমাণ করে যে ভুল ও চেষ্টার মাধ্যমে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রশংসনীয়।

অপর একটি হাদিসে মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, “যা তোমার উপকারে আসে তার ওপর আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অলস হয়ে বসে থেকো না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

এই শিক্ষা সন্তানদের মধ্যে উদ্যোগী মনোভাব ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলার মানসিক শক্তি গড়ে তোলে।

ইসলামি শিক্ষাবিদ আব্দুর রহমান আল-নাহলাবি উল্লেখ করেছেন যে মূল্যবোধ ও শিক্ষা শুধু মুখস্থ কথা থেকে আসে না; বরং জীবনের বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে তা স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়। (উসুলুত তারবিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আসালিবুহা, দামেস্ক: দারুল ফিকর, ২০০৭, পৃষ্ঠা: ৯০-৯৩)

সন্তান যখন ঘর ছাড়ে: পরিবারের সংকটে ইসলামের সমাধান

Read full story at source