‘এখন ৫৩ জন, একজন তো কমেই গেল’—অপ্রতিমকে শেষবিদায় বন্ধুদের
· Prothom Alo

গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে তখন ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) জানাজার প্রস্তুতি চলছে। চারপাশে কয়েক শ মানুষ। সবাই অপেক্ষায়, শেষবারের মতো অপ্রতিমকে বিদায় জানাবেন। হঠাৎ চোখে পড়ল কয়েকজন কিশোরকে। পরনে বিদ্যালয়ের পোশাক। অন্য সবার মতো তারাও দাঁড়িয়ে আছে সারিতে। চোখেমুখে অন্য রকম শূন্যতা।
Visit rhodia.club for more information.
কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে ওই কিশোরেরা জানাল, তারা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অপ্রতিম তাদের বন্ধু ও সহপাঠী। বন্ধুকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে এসেছে তারা। বিদ্যালয়ের ক্লাস ফেলে একসঙ্গে এসেছে ২৩ সহপাঠী।
তাদের একজন ইসমাইল হোসেন। সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কতজন, জানতে চাইলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘এখন ৫৩ জন, একজন তো কমেই গেল।’ কথাটি বলার সময় কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ইসমাইলের। বলল, অপ্রতিম সবার সঙ্গে মিশত। খুব ভালো ছেলে ছিল। কিছুটা থেমে ইসমাইল বলল, ‘আমাদের বন্ধুকে যারা হত্যা করেছে, আমরা তাদের ফাঁসি চাই।’
গতকাল শনিবারও যাদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল, আজ সেই বন্ধুর জানাজায় দাঁড়াতে হবে—এ বাস্তবতাই যেন মেনে নিতে পারছিল না অপ্রতিমের সহপাঠীরা। সিয়াম নামের আরেক সহপাঠী বলল, ‘একটা ফোনের জন্য আমাদের বন্ধুকে এভাবে খুন করা হলো। গতকাল যখন শুনেছি, প্রথমে বিশ্বাস করিনি। খুব খারাপ লাগছিল।’
১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। গতকাল কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশঅপ্রতিমকে শেষবারের মতো বিদায় দিতে এসেছে আরেক সহপাঠী আরিফুল ইসলাম। তাদের ৫৪ জনের মধ্যে অপ্রতিমের রোল ছিল ৩৭। আরিফুলের চোখে অপ্রতিম ছিল শান্ত ও নিয়মিত স্কুলে আসা একজন সহপাঠী।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকায় বেড়ে উঠেছে। পড়ত কোটবাড়ির বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলে। গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল সে। এরপর আর বাসায় ফেরেনি।
পরদিন শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় এরই মধ্যে মূল হোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান আজ রোববার বেলা দুইটার দিকে কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ও আসামি গ্রেপ্তারের বিস্তারিত জানিয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে ওই জঙ্গলে নেওয়া হয়। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তিনজন।
বন্ধু ও সহপাঠীদের এই দলগত ছবিতে নেই শুধু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। গন্ধমতী, কুমিল্লা। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাতআজ সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় কোটবাড়ির গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে। বেলা ১১টায় সেখানে দ্বিতীয় জানাজা হয়। এরপর স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতিমকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠের জানাজায় অন্য সবার সঙ্গে সারিতে দাঁড়িয়েছিল অপ্রতিমের ২৩ সহপাঠী। বিদ্যালয়ের পোশাক পরা এই কিশোরেরা বন্ধুকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে এসেছিল। শ্রেণিকক্ষে ফিরে গিয়ে যখন অপ্রতিমকে দেখবে না, তখন বন্ধুর সেই অনুপস্থিতির শূন্যতা নিশ্চয়ই তাদের স্মৃতিকাতর করে তুলবে।