ভোটার তালিকা: প্রশ্নবিদ্ধ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, কেজরিওয়াল, কপিল সিব্বাল, জগদীপ ধনখড়েরা

· Prothom Alo

ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনে বা এসআইআরের দরুন ভুগতে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ ভোটারকে। এবার সেই জালে ফাঁসলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কেজরিওয়ালের পুরো পরিবারই নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই তালিকায় রয়েছে দিল্লির মন্ত্রী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা প্রবেশ বর্মার নামও। প্রবেশের বাবা প্রয়াত সাহেব সিং বর্মা একসময় দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

শুধু তাঁরাই নন, রেখা গুপ্ত ও কেজরিওয়ালদের মতো নির্বাচন কমিশনের নোটিশ গেছে সাবেক উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় ও তাঁর স্ত্রী সুদেশ ধনখড়, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন লোকুর, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আইনজীবী কপিল সিব্বাল ও তাঁর স্ত্রী প্রমীলা সিব্বাল, বিজেপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সুব্রামানিয়ম স্বামীর কাছেও। দিল্লি প্রদেশ বিজেপির সাবেক সভাপতি বীরেন্দ্র সচদেব, তাঁর স্ত্রী ও ভাইও নোটিশ পেয়েছেন। তাঁদের পেশ করা নথিতে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে দাবি।

Visit h-doctor.club for more information.

আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে শনিবার রাতে ‘এক্স’ হ্যান্ডলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সবার নাম ভোটার তালিকা থেকে কীভাবে নিখোঁজ হয়ে যেতে পারে, সেটা বিস্ময়ের। অরবিন্দ কেজরিওয়াল ছাড়াও নোটিশ গেছে তাঁর স্ত্রী সুনীতা, পুত্র পুলকিত, বাবা গোবিন্দ রাম ও মা গীতা দেবীর কাছে। কেজরিওয়াল পরিবার নয়াদিল্লি বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা। তাঁরা যে বুথে ভোট দেন, সেই বুথের মোট ১১০ জনকে নির্বাচন কমিশন নোটিশ পাঠিয়েছে। এসআইআরের সুমারিতে গোটা কেজরিওয়াল পরিবার চিহ্নিত হয়েছে ‘আনম্যাপড’ হিসেবে।

কেজরিওয়ালদের নোটিশ পাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার কিছু পরেই প্রকাশ্যে আসে মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তর বিষয়টি। তিনি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নোটিশ পেয়েছেন ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি’ বা যুক্তিপূর্ণ অসংগতির দরুন। কেননা ইসির মতে, মা–বাবার সঙ্গে রেখার বয়সের ফারাক নাকি ১৫ বছরের কম। মুখ্যমন্ত্রী দিল্লির শালিমার বাগ কেন্দ্রের ভোটার।

এসআইআরের দরুন দিল্লির প্রায় ৩৩ লাখ ভোটারের বাড়িতে এমন নোটিশ পৌঁছেছে। এঁদের মধ্যে ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭৮৫ জন পড়েছেন ‘নন–ম্যাপিং’ বা আনম্যাপড বিভাগে, ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৪ জন ভোটারের নাম চিহ্নিত হয়েছে ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি’ বা যুক্তিপূর্ণ অসংগতি বিভাগে। এঁদের প্রত্যেককে শুনানিতে আসতে হবে। প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য দাখিলের মধ্য দিয়ে নাম তুলতে হবে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাজনৈতিক নেতা বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শুনানিকেন্দ্রে যেতে হবে না। তাঁদের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী কর্মকর্তারা বাড়ি গিয়ে নথি–তথ্য যাচাই করে আসবেন।

এমন ধরনের নোটিশ পাঠানোর খবর চাউর হতেই ইসি নড়েচড়ে বসে। কমিশনের পক্ষে বিবৃতিও দেওয়া হয়। শালিমার বাগের ‘ইআরও’ এক বিবৃতিতে জানান, এটা ঠিক যে মুখ্যমন্ত্রীকে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আধিকারিকেরা সরেজমিনে গিয়ে নথিপত্র যাচাইও করেছেন। তারপর তাঁর নাম বৈধ বলে প্রমাণিত হয়েছে। নভেম্বরের গোড়ায় যে চূড়ান্ত তালিকা পেশ হবে, তাতে মুখ্যমন্ত্রীর নাম থাকবে।

কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের নাম না থাকা সম্পর্কে ইসি জানিয়েছে, ওই পরিবারের এনুমারেশন ফর্মের তথ্য সম্পূর্ণ ছিল না। তাই আগের এসআইআরের সঙ্গে তা মেলেনি। সেই কারণেই নোটিশ পাঠানো হয়। নথিপত্র যাচাই হলে তাঁদের নামও চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় উঠে যাবে।

দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) অশোক কুমার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় যাঁদের নাম ও জন্মতারিখের মধ্যে অসংগতি দেখা গেছে, তাঁদের এক তালিকা কমিশন অনলাইনে প্রকাশ করেছে। তাঁদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেশ করার জন্য সময়ও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এখন মতামত ও আপত্তিসংক্রান্ত শুনানি চলছে। তাই নোটিশ। তিনি বলেন, মূলত দুই ধরনের নোটিশ যাচ্ছে। একটি আনম্যাপড ভোটারদের জন্য, অন্যটি পাঠানো হয়েছে যাঁদের নাম ও জন্ম তারিখে অসংগতি দেখা গেছে।

কপিল সিব্বাল ইসির এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছেন। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াকে তিনি ‘দূষিত’ ও ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে সমালোচনা করেছেন। এসআইআর–প্রক্রিয়াকে তিনি স্রেফ ভোট চুরি জানিয়ে বলেছেন, গণহারে এই নাম বাদ দেওয়ার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না এমনকি বিচারপতি ও কূটনীতিকেরাও। সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর–প্রক্রিয়াকে সাংবিধানিক বৈধ জানালেও যেভাবে এটা পরিচালিত হচ্ছে তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম নিয়ে শেষ পর্যন্ত সংশয় না থাকলেও প্রশ্নবিদ্ধ সাধারণ ভোটারদের কতজনের নাম দিল্লির চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় স্থান পাবে, তা নিয়ে সংশয় সর্বত্র। এই সংশয়ের উদ্রেক হয়েছে ইসির কারণেই। পশ্চিমবঙ্গে বাদ যাওয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ ভোটারেরা, যাঁদের নাম গত মে মাসের বিধানসভা ভোটে ওঠেনি, যাঁদের নাম নিয়ে নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনাল এখনো করতে পারেনি, আসন্ন উপনির্বাচনেও তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না। যুক্তিপূর্ণ অসংগতির তালিকায় ছিল ২৭ লাখ ভোটারের নাম। গত ডিসেম্বর থেকে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আট মাসে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ইসিতে জমা পড়েছে ৩৪ লাখ ১৩ হাজার আবেদন। এর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ আবেদন গৃহীত হয়েছে। এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল হওয়া মামলায় নির্বাচন কমিশন নিজেই হলফনামা দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে।

কমিশনের জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, এই ৮ মাসে অন্য ভোটারদের নাম বাদ দিতে জমা পড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার আবেদন। এই আবেদনের ৯০ শতাংশই কমিশন গ্রহণ করেছে। সেই অনুযায়ী ভোটার তালিকা থেকে কমিশন কেটে দিয়েছে ৫ লাখ ৭২ হাজারের বেশি নাম। সন্দেহজনক ভোটারের নাম বাদ দিতে যে কেউ ইসির এক বিশেষ ফর্ম (৭ নম্বর) ভরে জমা দিতে পারে। ‘বৈধ’ ভোটারদের ঝুলিয়ে রেখে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ইসি এই আবেদনগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিরোধীরা এটাকেই ভোট চুরি বলছে। তাদের অভিযোগ, একদিকে ট্রাইব্যুনালের দীর্ঘসূত্রতায় লাখ লাখ বৈধ ভোটার ভোট দিতে পারছেন না, অন্যদিকে সরকারপক্ষের আপত্তিতে লাখ লাখ নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া ইসির হলফনামা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ট্রাইব্যুনালে সব মিলিয়ে জমা পড়েছে মোট ৩৮ লাখ ২০ হাজার আবেদনপত্র। এর মধ্যে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ফয়সালা হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২ হাজার আবেদনের। ঝুলে রয়েছে ৯৭ শতাংশ আবেদনপত্র। এসআইআর মামলার সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীদের মতে, এই গতিতে কাজ হলে ও এই হারে ফয়সালা হলে সব মামলার নিষ্পত্তি হতে ১৫ বছর লেগে যাবে। দিল্লির হালও তেমন হবে কি?

Read full story at source